পরিবেশ বান্ধব ক্যামব্রিজ ইকো মসজিদ

দীর্ঘদিন ধরে মসজিদের অভাব বোধ করে আসছে যুক্তরাজ্যের প্রাচীন শহর ক্যামব্রিজের মুসলিমরা। আশির দশকে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় যে কজন গ্র্যাজুয়েট পাশ করে বের হয়েছেন তার মধ্যে নামাজ আদায় করার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৪৫ জন।

নামাজের জায়গার অভাবে এক সাথে ৪৫ জনের বেশি মুসলিম নামাজ আদায় করতে পারেনি। সেই ক্যামব্রিজেই কেবল যুক্তরাজ্যের নয় গোটা ইউরোপের প্রথম পরিবেশ বান্ধব মসজিদ নির্মিত হয়েছে।

মসজিদটির নাম ‘ক্যামব্রিজ ইকো মসজিদ। ২৩ মিলিয়ন ব্রিটিশ পাউন্ড ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে মসজিদটি। এক হাজার মুসুল্লি এক সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন। এটি কেবল মসজিদটির অভ্যন্তরে আর বাইরেসহ মোট ৫ হাজার মুসুল্লি এক সাথে নামাজ আদায় করতে পারেন।

১৭ শতকে পারস্যের কবিতায় বাগানের বর্ণনা পাওয়া যায়, ছবি: মিডল ইস্ট আই

দশকব্যপি পরিকল্পনা:

দশকব্যপি পরিকল্পনার পর ২৪ এপ্রিল ২০১৯ ইকো- মসজিদটির উদ্বোধন করা হয়। মসজিদটির কাঠামো পরিবেশগত আদর্শ বজায় রাখা হয়েছে। রয়েছে কার্বন নির্গমন ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা, আর এয়ার সোর্স হিট পাম্প ব্যবস্থা।

মসজিদটির চোখ ধাঁধাঁনো নকশা দেখে অবাক হয়েছেন মুসলিমসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরা।

স্থাপতির উপলব্ধি:

মসজিদটি মার্কস বারফিল্ড আর্কিটেক্টসের নকশায় নির্মিত, যারা ২০০৯ সালে মসজিদটি নির্মাণের দায়িত্ব পায়। কোম্পানিটির প্রধান স্থপতি জানিয়েছেন এটি একুশ শতকের সত্যিকারের ব্রিটিশ মসজিদ।

এই মসজিদটি বিশ্ব জগতের সাথে একটি সাংষ্কৃতিক মেলবন্ধনের মাধ্যম হয়ে ওঠবে একই সাথে বিশ্বব্যাপি মুসলিম সম্প্রদায়ের পরিবেশগত বার্তা বহন করবে।

এই ঝর্ণাটি কেমব্রিজ মসজিদ উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, ছবি: মিডল ইস্ট আই

২৩ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে নির্মিত ইউরোপের প্রথম পরিবেশবান্ধব মসজিদটি ২০১৯ সালের মার্চে অনানুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত স্থপতি মার্কস বারফিল্ড ২০০৯ সালে গ্রিন মসজিদের ডিজাইন করেন।

নানান প্রতিবন্ধকতা:

২০০৯ সালে মসজিদটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে এর দুই বছর পর ২০১১ সালে ক্যামব্রিজে এর বিরোধীতা করে একদল মানুষ। তারা বেনামী লিফলেট বিতরণ করে মসজিদটির নির্মাণে বাধা দেওয়ায় জন্য শহরের বাসিন্দাদের আহবান জানান।

তবে ক্যামব্রিজ সিটি কাউন্সিল জানিয়েছে, মসজিদটি নির্মাণে তারা ৫০ টির বেশি বাধা দেওয়ার চিঠি পেয়েছেন। অন্যদিকে মসজিদ নির্মাণের সমর্থনে দুই শতাধিক চিঠি পায় সিটি কাউন্সিল।

দূর থেকে কেন্দ্রীয় ঝর্ণার দৃশ্য, ছবি: মিডল ইস্ট আই

মসজিদটি নির্মাণের জন্য পরিকল্পনাটি ২০১২ সালে অনুমোদন পায়। ২০১২ সালে ক্যামব্রিজ শহর কর্তৃপক্ষ মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেয়। সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়।

ইউরোপের প্রথম সবুজ মসজিদ:

ইউরোপের প্রথম সবুজ এ মসজিদটি ইসলাম সম্পর্কে জানতে সবাইকে আহ্বান জানানো হয়। ‘ক্যামব্রিজ সেন্ট্রাল মসজিদটি উদ্বোধনের পর সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়।

পর্যটন নির্দেশক, চিত্রশিল্প প্রদর্শন, ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রদর্শন, মা ও শিশু কার্যক্রমসহ আরও অন্যান্য বিষয়ে নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন করার ব্যবস্থা রয়েছে এর অভ্যন্তরে। শিশু ও মায়েদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থাপনা।

বৃক্ষ ও পুষ্প সুশোভিত বাগিচায় হেঁটে মসজিদ দর্শন, অজুখানা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমের বিবরণও রয়েছে মসজিদটিতে। নামাজের জন্য উন্মুক্ত করার পর থেকে সবাই মহাসমারোহে নামাজ আদায় করতে আসেন।

কুরআনে বর্ণিত চারটি জান্নাতের বাগান দ্বারা অনুপ্রাণিত তাজমহলের বাগান,ছবি:মিডল ইস্ট আই

পুরো মসজিদটি প্রাকৃতিক আলো ও বাতাস চলাচলের উপযুক্ত হওয়ায় সব বয়সী মুসুল্লিরা স্বাচ্ছান্দ বোধ করেন নামাজের আগে ও পরে।

বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা সাধারণত অন্য ধর্মের অতিথিদের জন্য মসজিদ সর্বাঙ্গীনভাবে উন্মুক্ত করেন, যাতে তারা ইসলামী বিশ্বাসের রূপ-বৈশিষ্ট্য দেখতে পান।

প্রতি বছর ‘ভিজিট মাই মস্ক’দিবসে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ বেশ কয়েকটি দেশে মসজিদ প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এখন থেকে ক্যামব্রিজ মসজিদ কর্তৃপক্ষও এ আহবান করতে পারবে।

শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যের পুরস্কার লাভ:

ইতিমধ্যে ক্যামব্রিজের ‘গ্রিন মসজিদ’টি তার উদ্ভাবনী নকশার জন্য শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যের পুরস্কার লাভ করেছে। ‘দ্য এজে আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ডস’ যুক্তরাজ্যের স্থাপত্য শিল্প বিষয়ক একটি সম্মানজনক পুরস্কার।

২০ নভেম্বর ২০১৯ ক্যামব্রিজের ইউনিভার্সিটি আর্মস-এ এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। দ্য রয়েল টাউন প্ল্যানিং ইনস্টিটিউটস ইস্ট অব ইংল্যান্ড পুরস্কার ঘোষণা করে। এতে অংশ নেন ১০০ স্থপতি ও পরিকল্পনাবিদ।

ইসলামী উদ্যানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সুগন্ধি, ছবি: মিডল ইস্ট আই

ঘোষণায় বলা হয়, ‘গ্রিন মসজিদ’ অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক পদক্ষেপ, যা সাধারণত উপেক্ষা করা হয়। এটি প্রকৃত সৌন্দর্যের দৃষ্টান্ত স্থাপনের সক্ষমতা দেখিয়েছে। এর নির্মাণে পরিবেশগত বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে।’

বিচারক প্যানেল গ্রিন মসজিদের নকশা ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধার প্রশংসা করে ভবনটি এই যুগের সাংস্কৃতিক ও নৈসর্গিক ‘ল্যান্ডমার্ক’ হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেছে।

গ্রিন মসজিদের ট্রাস্টি ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ জানায়, ‘একটি মসজিদ শহরের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের প্রতীক হয়ে উঠা গুরুত্বপূর্ণ। যা ইকো মসজিদ দেখিয়েছে। ‘

মসজিদটির অবস্থান:

ক্যামব্রিজ সেন্ট্রাল মসজিদটির অবস্থান মিল রোডে অবস্থিত। ক্যামব্রিজ মসজিদে নগরীর আনুমানিক ৬ হাজার মুসলমান সমবেত হতে পারবে। ইসলামিক কেন্দ্রে ও আশপাশের রুমগুলোতে বিভিন্ন শিফটে হাজারো মুসল্লি নামাজ আদায় করছে।

মুসলিমদের জন্য ক্যামমব্রিজের মতো পরিবেশবান্ধব একটি উপযুক্ত মসজিদের দরকার ছিল। ক্যামব্রিজ বিশে^ও একটি নামকরা শহর। প্রাচীন এ শহরে বহু-সাংস্কৃতিক স্থান থাকায় মসজিদটি বিশেষভাবে পরিচয় বহন করছে।

সাংস্কৃতিক সেতু:

মসজিদে একটি প্রার্থনা হল, অযুখানার স্থান, ইমামের পরিবার ও ইসলামি স্কলারদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। এই মসজিদটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম ধর্মীয় বিশ্বাসী ইসলাম সম্প্রদায়ের জন্য একটি সাংস্কৃতিক সেত। এ মসজিদের ধারণা এই বার্তা বহন করে যে, একবিংশ শতাব্দীর সত্যিকারের পরিবেশগত মসজিদ এটি।

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতেও চার-ভাঁজযুক্ত নকশা দেখা যায়,ছবি: মিডল ইস্ট মনিটর

তুর্কি প্রেসিডেন্টের উপলব্ধি:

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইয়িপ এরদোগান আনুষ্ঠানিকভাবে ইংল্যান্ডের পূর্বে ক্যামব্রিজ কেন্দ্রীয় মসজিদটি ৪ ডিসেম্বর-২০১৯ সালে উদ্বোধন করেছেন।

ইউরোপের প্রথম ইকো মসজিদটি সৌর প্যানেল দিয়ে সজ্জিত, সবুজ শক্তির উপর নির্ভরশীল ও জিরো কার্বন নিয়ন্ত্রক। ক্যামব্রিজের এই ইকো মসজিদটিকে ক্রমবর্ধমান ইসলাম বিরোধ দের সর্বোত্তম জবাব বলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছেন এরদোগান।

মসজিদটি উন্মক্ত করার প্রথম মুহুর্ত থেকেই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংহতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। আল্লাহ সহায় হলে ভবিষ্যতে ঐক্য, কথোপকথন ও শান্তির কেন্দ্র হিসাবে অবিরত থাকবে বলে এরদোগান উলব্ধি করেন।

ব্রিটিশ মুসলিম সংগীতশিল্পী ইউসুফ ইসলাম, যিনি পূর্বে ক্যাট স্টিভেনস নামে পরিচিত ছিলেন, তিনি মসজিদের পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে ছিলেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন।

আরও বেশ কয়েকটি দাতা তুরস্কের সরকার এবং কাতার জাতীয় তহবিলসহ মসজিদের উন্নয়নে অবদান রেখেছিলেন।

লক্ষ্য যখন পরিবেশ সুরক্ষা:

মসজিদের ওয়েবসাইট অনুসারে, এর নকশাটি ইসলামী ও ইংরেজ উভয় ধর্মীয় স্থাপত্য রীতি অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়েছে। মসজিদটির নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেখানে একবিংশ শতাব্দীর পরিবেশগত ব্যবস্থাপনার ধারণা প্রকাশ করা হয়ছে।

অত্যাধুনিক গরম ও শীতল প্রযুক্তি রয়েছে মসজিদটিতে। সব কিছু সৌর প্যানেলের সংগ্রহ থেকে সরবরাহ করা হয়। এটি প্রকৃতির সাথে মানুষের সংযোগ স্থাপন করার কথা মনে করিয়ে দেয়। যা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম নির্মিত। একবিংশ শতাব্দীর নতুন যাত্রায় যুক্ত হলো ইকো-মসজিদটি।

ইসলাম ও ইকোইজম:

ক্যামব্রিজ কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম মসজিদটির প্রথম জুম্মুয়ার খুতবায় জানান, নির্মাণের ১১ বছর অতিবাহিত হলো মসজিদটির, এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকেরা একাধিক উপায়ে এই মসজিদ নির্মাণে সহায়তা করেছে।

ইংল্যান্ডের প্রাচীন শহর ক্যামব্রিজ। এখানেই ইউরোপের প্রথম ইকো মসজিদটিতে প্রথম জনসমাগমের জন্য খোলা উন্মক্ত করা হয়। স্থানীয় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীরা মসজিদ আসাদের স্বাগত জানিয়েছেন।

মসজিদটি উদ্বোধনের পর সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যম ঢালাওভাবে বিশেষ সংবাদ প্রকাশ করেছে। শুক্রবারের প্রথম জুম্মা বিশ্বকে জাগিয়ে তুলেছিল। জুম্মা ও মসজিদটির পরিবেশ আলাদা অনুভব করেছিলেন উপস্থিতরা।

মসজিদটি আল্লাহর ঘর হলেও বিশ্বের একমাত্র স্থান যেখানে যে কোন মুসলিম, ভ্রমণকারী, অপরিচিত ও ছাত্ররা এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এর অনুভূতি নেওয়ার সুযোগ পান।

অসাধারণ এক অনুভূতির স্থান:

মসজিদের মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা জড়ো হন, বিয়ে করেন ও প্রার্থনা করেন। জামাত খানায় ছোট ছোট শিশুরা ছুটে গিয়ে কাঠের স্তম্ভের পেছনে লুকিয়ে খেলা করেন। মায়েরা নামাজ আদায় করার সময় ছোটদের সাথে যত্নে রাখেন তাদের বোনরা।

মসজিদটির ভেতরে প্রবেশ করে সময় ও প্রকৃতির সংস্পর্শে আসেন মুসলমানরা। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মাধ্যমে সিজদাসহ সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে থাকেন মুসলিমরা। এ সময় ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা বৈশ্বিক কর্মকাণ্ডের কথা ভুলে কিছু সময় ইবাদতে মশগুল থাকেন।

সূর্যাস্তের প্রাকৃতিক চক্র অনুসারে যেভাবে সূর্যোদয় হয়, যখন সূর্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে ও যখন আবার সূর্য ডুবে যায় তার সবই রয়েছে মসজিদটিতে যা জীবন প্রকৃতির মধ্যে নিহিত থাকায় নামাজের সময়টি স্মরণ করিয়ে দেয় অসাধারণ এক অনুভূতির।

আদম ও হাওয়া স্বর্গের বাগান থেকে পৃথিবীতে এসেছিলেন। তাই বাগানগুলোকে মানব জী নের সূচনা ধরা হয়। এই পৃথিবীতে মানুষ কেবল স্বর্গের বাগানে ফিরে যাওয়া আশা করতে পারে।

প্রত্যাবর্তনের এই বিশ্বাসগুলোর মধ্যে অন্তর্নিহিত একটি চক্রীয় কাঠামো রয়েছে ও ক্যামব্রিজ মসজিদ প্রকল্প প্রকৃতির সাথে বিশ্বাসের ধারাবাহিক ও নিয়মিত আন্তসংযোগের প্রতীক স্বরুপ।

জীবনের মতো প্রকৃতির মধ্যে সংযোগ স্থাপন:

মসজিদটিতে ব্যবহার করা হয়েছে সৌর প্যানেল ও গ্লাস। ছাদে থাকা সৌর প্যানেল ও গ্লাস থেকে প্রাকৃতিক আলো এসে আচ্ছাদিত হয় কাঠের কাঠামোতে।

মসজিদের অভ্যন্তরে গাছের কাঠামোর প্রতিরূপ তৈরি করা হয়েছে যা মসজিদটি মুসলমানের জীবনের মতো প্রকৃতির মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে দেয়।

মসজিদটির ডিজাইন সাধারণ তবে খুবই সুন্দর। মেঝেতে রাখা হয়েছে ব্যতিক্রমী ধূসর রংয়ের কার্পেট। যা নিচের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ক্যামব্রিজের স্থানীয় যুবক দাতব্য সংস্থা ‘ আল আনসার’ মেঝেটির জন্য সব কার্পেটের ব্যবস্থা করেছে।

মসজিদটির চারপাশ নান্দনিক ও প্রকৃতির সংরক্ষণের ধারণার উপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে। সম্পদশালী ও প্রকৃতি প্রেমি বিশেষ করে যারা আধ্যাত্মিক সংযোগে বিশ্বাসী মসজিদটির জন্য অর্থ তাদের কাছ থেকে সরবরাহ করা হয়েছে কারণ তারা প্রকৃতি ধ্যানে বিশ্বাস করেন।

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থাপনা:

বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে রাখা ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাপনা রয়েছে মসজিদটিতে। প্রতিদিন বাগানে পানি দেওয়া, ফ্লাশিং ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষ্কারের কাজে ওই জমাকৃত পানি ব্যবহৃত হয়। যা মসজিদের পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে যাচ্ছে।

একই সঙ্গে পরিবেশ বান্ধব যাতায়াতকে উৎসাহিত করছে। মসজিদটির আশেপাশের অঞ্চলে সাইকেল রাখার জন্য কাঠের রেক তৈরি করা হয়েছে। সেখানে মসজিদে আসা মুসুল্লিরা ও দর্শনার্থীরা সাইকেল রাখতে পারেন নির্দিধায়।

ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের ভাষ্য:

ইউরোপের কোনো দেশে ইকো-মসজিদের ধারণাটি এই প্রথম। টিম উইন্টার যিনি শায়েখ আবদুল হাকিম মুরাদ নামেও পরিচিত। তিনি এই মসজিদ প্রকল্প ট্রাস্টের চেয়ারম্যান।

এ ছাড়া তিনি ক্যামব্রিজ মুসলিম কলেজের ডীন ও ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির একজন অধ্যাপকও। ক্যামব্রিজ শহরের মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মসজিদ নির্মাণের ধারণাটি প্রদান করেন তিনি।

ক্যামব্রিজ শহরে এই মসজিদটিকে উপযোগী বলে বিবেচনা করা হচ্ছে কারণ। ক্যামব্রিজ ইন্টেলেকচুয়াল ‘ক্রস রোড’ হিসেবে পরিচিত। যাকে বাংলায় বুদ্ধিজীবীদের চৌরাস্তাা’’ বা ‘‘ বুদ্ধিবীজীদের আড়াআড়ি পথ’’ বলা হয়।

ক্যামব্রিজে রয়েছে বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও মুসলিম এবং ইসলামিক কলেজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী ইনস্টিটিউট। যেখান থেকে গোটা বিশ্বের পন্ডিতদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

মেধা সমৃদ্ধ শহর হিসেবে ক্যামব্রিজের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। ক্যামব্রিজ বহু দশক ধরে ইসলামী ইতিহাসের জন্য উল্লেখযোগ্য এবং এখানে অধ্যয়নসহ বসবাস করছেন মুসলিমরা।

মসজিদ নির্মাণের নেপথ্যের কারিগর শায়েখ আবদুল হাকিম মুরাদ একজন শিক্ষক হিসেবে থাকবেন বলে ঘোষণা দেন। ইকো মসজিদটির প্রস্তাাবনা দিয়েও মসজিদের কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পরে কোনও আনুষ্ঠানিক পদে যাওয়া তার কোনও ইচ্ছা ছিল না।

তবে এটা স্পষ্ট যে প্রকল্পের সাফল্য ও এটিকে এগিয়ে নিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর অবদানটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ক্যামব্রিজ মসজিদকে ঘিরে মিডিয়াগুলোর আকর্ষণ করার আগে মসজিদ নির্মাতারা এর পরিবেশগত সাফল্য ও স্থাপত্যের দিকে মনোনিবেশ করেছেন।

কিন্তু  এটি লক্ষ করা উচিৎ যে এতো বড় একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা সহজে বাস্তবায়ন করার নেপথ্যে সবার সহায়তা ও উপস্থিতি অনেক কাজে লেগেছে।

নবীর যুগের পুনরাবৃত্তি:

কম সময়ের জন্য পবিত্র এ মসজিদটি খালি থাকলেও উপাসনার কাজে নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। মুসলমানদের প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর সময়ে মসজিদ প্রার্থনার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

তবে খানাপিনাসহ সব ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো মসজিদে। ভৌগোলিক দিক থেকে ও সাম্প্রদায়িকভাবেও মসজিদগুলো ছিল কেন্দ্র। ক্যামব্রিজের ইকো মসজিদও একই কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পার্কিং সম্পর্কে বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছিল পরে ভূ-গর্ভস্থ পার্কিংয়ের ব্যবস্থাযুক্ত করা হয়। মসজিদের প্রবেশ পথে শিশু ও পরিবারগুলোর জন্য বেঞ্চসহ নির্মাণ করা হয়েছে প্রাকৃতিক পার্ক বা উদ্যান।

এই উদ্যানগুলো কোরআনের অনুপ্রেরণায় তৈরি করা হয়েছে। কেননা উদ্যানকে কোরআনে স্বর্গের উপহার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইবাদত ও পবিত্রতার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের উপর গুরুত্বারোপ করে উদ্যানের ঠিক মাঝখানে একটি ঝর্ণা বসানো হয়েছে। একই সাথে নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মেনে ভবনের দুপাশে গাছ লাগানো হয়েছে। এমন মুসলিম যিনি গাছ বা গাছ লাগিয়ে কোন মানুষ, পাখি বা পশুর জন্য জমির বীজ বপন করেছে, তবে তা ও তা থেকে সদকা হিসাবে গণ্য হবে। -বুখারী, মুসলিম

বাগানটি মসজিদ ভবনের প্রবেশের সামনে অবস্থিত হওয়ায় অমুসলিমরাও স্থানটি ব্যবহার করছে। এখানে মুসলিমদের পাশাপাশি অমুসলিমদের পরিবারগুলোকে এখানে আসতে দেখা যায়। তারাও পবিত্র মসজিদের প্রাঙ্গণে এসে এর মনোরম দৃশ্য উপভোগ করেন।

উন্মুক্ত ক্যাফে:

অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজও করা হচ্ছে এর প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরে। যেমন- এখানে একটি ক্যাফে সবার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, রমজান মাসে বিবাহের আয়োজনসহ খাওয়ানোর বন্দবস্থ রয়েছে।

তবে রমজান মাস ছাড়া প্রতিদিন নিয়মিত কাজ চলে এ স্থানে। মসজিদটির আশেপাশে বিভিন্ন ধরনের জায়গা রয়েছে। ইবাদতের পাশাপাশি সুযোগ রয়েছে আর্ট এক্সিভিশনের জায়গা।

এ মসজিদটির সাথে কফি শপের মডেল মসজিদের সাদৃশ্য রয়েছে। মসজিদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণী ও সম্প্রদায়ের লোকেরা সমবেত হয়ে আনাগোনা করে মুখরিত রাখেন।

ক্যামব্রিজ ঐতিহাসিকভাবে ব্রিটেনের মেধা সমৃদ্ধ একটি শহর। ব্রিটিশ মুসলমানদের অবদান ও বিকাশের প্রতীক হিসাবে ক্যামব্রিজ মসজিদটি স্থানীয় জনগণের বহুমুখিতা ও যুক্তরাজ্যে ক্যামব্রিজের জাতীয় পতাকাবাহী কেন্দ্র হিসাবে কাজ করছে।

সমর্থন জানান খ্রিস্টানরাও:

আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদ ও ইসলামফোবিয়া নিয়ে বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিপ্রেক্ষিতে এই মসজিদটি কেমব্রিজের বাসিন্দাদের কাছ থেকে যে সমর্থন পেয়েছে তা উৎসাহজনক।

ক্যামব্রিজের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের – এমমানুয়েল ইউনাইটেড রিফর্ম চার্চ এই প্রকল্পে দেড়শ পাউন্ড অনুদান দিয়েছে এবং ইস্ট মিল আরডি অ্যাকশন গ্রুপের মতো স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলো মসজিদের প্রয়াসের প্রশংসা করেছে।

২০১১ সালে, যখন ইংলিশ ডিফেন্স লিগ নামে একটি খ্রিস্টান সংগঠন মসজিদ নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেছিল, তখন স্থানীয় খ্রিস্টানরা তাদের উপস্থিতিকে স্বাগত জানিয়ে পাল্টা-বিক্ষোভের আয়োজন করে।

বিরোধী বিক্ষোভকারীদের চেয়ে মসজিদ নির্মাণের পক্ষে স্থানীয় খ্রিস্টানদের সংখ্যা ছাপিয়ে যায়।

শহরটির খুব অল্প জায়গাজুড়ে ইসলাম ধর্মের জন্য ইবাদতের সুযোগ থাকা সত্তে¡ও ক্যামব্রিজের মুসলমানদের সাথে খ্রিস্টানদের সাথে সত্যিকারের বোঝাপড়া রয়েছে।

খ্রিস্টান আর্কিটেকচার ফার্ম দ্য স্কাইলাইন, টোলিং বেলস ও চার্চ স্টেপলগুলোতে প্রায় প্রতিটি রাস্তার কোণে খ্রিস্টান সাম্প্রদায়িক স্থানকে বোঝায়।

মুসলিম শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা শুক্রবারের জুম্মা ও রমজানের সময় ইফতার করার মতো সামান্য স্থানই রয়েছে।

মুসলিম ছাত্র ও বাসিন্দাদের অবশ্যই একত্রিত হতে হবে, ইফতার করতে হবে, কয়েকটি ক্ষুদ্র স্থানে জুমার নামাজ পড়তে হয়।

ক্যামব্রিজ শহরের সেন্ট কলম্বাস চার্চের উত্তরে মাউসন রোডের একটি বাড়িতে ছোট একটি মসজিদ রয়েছে যেখানে মুসলিম বাসিন্দারা রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুক্রবারের নামাজ আদায় করে থাকেন।

এটি সহজেই অনুভব করা যায় যে ক্যামব্রিজে মুসলমানদের জন্য উপাসনা করার জায়গার অভাব রয়েছে। এখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবদান ও তাদের বৃদ্ধির অস্বীকার করা হচ্ছে।

এই ছোট ছোট প্রার্থনা কক্ষগুলো শহরের ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনসংখ্যাকে ঠাই দিতে হিমশিম খায়। বহু বছর ধরে ক্যামব্রিজে থাকা মুসলিমরা ঈদের নামাজও পড়ার সুযোগ পায়নি।

১৯৮০ সালের গ্রাজুয়েটদের মধ্যে মাত্র ৪৫ জন নামাজ আদায়ের সুযোগ পান। এই সংখ্যাটি এখন ৩ হাজারে উন্নীত হয়েছে।

ক্যামব্রিজ মসজিদটি শহরের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও মুসলিম সম্প্রদায়সহ অন্য সম্প্রদায়ের জন্য সংযোগ স্থাপন করেছে। তবে মসজিদটির আয়তনের দিক দিয়ে প্রার্থনা হলের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এটি বিশ্বব্যাপী এই শহরে মুসলমানদের অবদানকে তুলে ধরছে।

প্রাচীন বিল্ডিংগুলোর মধ্যে সোনার গম্বুজ, যা আকাশচুম্বি চকচক করছে।

নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা ক্ষেত্র:

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মসজিদটিতে বিশেষত নারীদের প্রার্থনার জন্য তিনটি পৃথক ক্ষেত্র রয়েছে। মসজিদে সামাজিক জমায়েত ‘হালাকা’র ব্যবস্থা রয়েছে।

মসজিদে নারীদের জন্য প্রার্থনার জায়গা রাখার ব্যবস্থা থাকার কথা থাকলেও ব্রিটেনের অনেক মসজিদ নারীদের জন্য স্থান নির্ধারণে ব্যর্থ। নবী (সা) এর সময়ে মসজিদে নারীদের নামাজের স্থান রাখাসহ মসজিদ ছিল মুসলমানদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু।

ক্যামব্রিজের ইকো-মসজিদটি ঐতিহাসিক ও বর্তমান পরিবেশের সাথে মিল রেখে তৈরি করা হয়েছে।

ক্যামব্রিজ মসজিদ প্রকল্পের বিপরীতে কয়েক দশক আগে অনেক ব্রিটিশ মসজিদ নির্মিত হয়েছিল যা ধর্মান্তরিত ও ক্ষুদ্র মুসলিমদের দ্বারা নির্মিত হয়।

তাদের মধ্যে অধিকাংশই অস্থায়ীভাবে যুক্তরাজ্যে কাজের জন্য এসে অভিবাসী হয়েছিলেন। ওই সময় মসজিদগুলোতে কম সংখ্যক মুসলমান সমবেত হতেন তারা কেবলমাত্র দৈনিক নামাজ পড়তেন।

ক্যামব্রিজের বর্তমান আবু বকর মসজিদের মতো অনেকগুলো নামাজের স্থান হিসেবে ক্ষুদ্র পরিসরে প্রার্থনার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মসজিদগুলো তখন জাতীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে।

নারীদের জন্য স্থানীয় মসজিদগুলোতে ইকো মসজিদের মতো বড় স্থান ছিল না।

তবে ব্রিটেনে ক্রমবর্ধমান বিভিন্ন মুসলিম পরিবারের জন্য কেমব্রিজে মসজিদের মতো জাতীয় বা ধর্মীয় পরিচয় দেওয়ার ছাড়াও এটি আচার অনুষ্ঠানের বাইরেও বিভিন্ন উদ্দেশ্যে নির্মিত।

ক্যামব্রিজের মুসলিম নারীদের জন্য মসজিদে জায়গা রাখার বিষয়ে ২০০৯ সালের প্রথম দিকে একটি সমীক্ষা চালানো হয়। তাদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তারা কোন ধরনের স্থান চান- তারা কি কেবল নারীদের স্থানেই প্রার্থনা করতে চান, নাকি বিভাজন চান।

জরিপে বিভিন্ন নারীদের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, যার ফলস্বরূপ মহিলাদের একাধিক মনোনীত অঞ্চল তৈরি হয়েছে। নারী ও ছোট বাচ্চাদের জন্য একটি স্বচ্ছ তবে সাউন্ডপ্রুফ রুম দেওয়া হয়েছে, তাদের নিজস্ব মিহরাবসহ।

পর্দার পাশাপাশি মাঝখানে খালি জায়গাগুলোর পাশাপাশি প্রধান প্রার্থনা হলগুলিতেও মহিলাদের নিজস্ব এলাকা রয়েছে। এখানে বিশেষত মহিলাদের জন্য নির্দিষ্ট করা একটি শ্রেণিকক্ষ, একটি পুশচেয়ার জোন, একটি ন্যাপিং চেঞ্জিং রুম এবং একটি স্বাস্থ্যকর কেন্দ্র রয়েছে।

মসজিদের প্রবেশ দ্বারটিও সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও পেছনে পৃথক প্রবেশ দ্বার রয়েছে যেখান দিয়ে মহিলারা পৃথকভাবে প্রবেশ করতে পারে।

ক্যামব্রিজ মসজিদের এই সূ²তাগুলো দেখায় যে প্রকল্পটি কীভাবে ইসলামের শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি করা হয়েছে। এই মসজিদটি মুসলিম নারীদের বিকাশ ও সত্যিকারের অস্তিত্ব রক্ষার প্রতীক।

মসজিদের নীতিগুলো মধ্যে অন্যতম হলো মানুষ ঐক্যের অনুভূতি পায়। মসজিদটির ভেতরে খুতবার সময় খতিব কোরআনের আলোচনা করেন ইংরেজি ও আরবিতে।

মসজিদটি জ্যামিতিক ইসলামিক নিদর্শনগুলোর আদলে সজ্জিত, যা স্পেনের গ্রানাডা ও মরক্কোর মারাকেশের মতো পুরানো শহরেই পাওয়া যায়।

আল-আন্দালাসের বুদ্ধিবৃত্তিক সময়কে স্পর্শ করে। ওই সময়ে গণিত ও জ্যামিতিক উদ্ভাবন হয়েছিল। মসজিদের মেঝেতে মার্বেল পাথরে জ্যামিতিক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে। মেঝে জ্যামিতিক চিত্রের সাহায্যে ডিজাইন করা হয়েছে।

জ্যামিতিক নকশাগুলো পুরো বিল্ডিংয়ের বৈশিষ্ট্য, এগুলো জটিল, স্তরযুক্ত। কাঠের স্তম্ভের গাছের শৈলীর কাঠামো দেওয়ালগুলোর বিপরীতে প্রাকৃতিকভাবে লাগানো হয়েছে। যা গাছের মতো আলোকিত হয়ে আল্লাহর অনুগ্রহ, প্রকৃতির স্মৃতি অনুভূতি এনে দেয়।

মসজিদটিতে অন্যান্য উপাদানের ব্যবহারের পাশাপাশি কাঠের ব্যবহার করা হয়েছে যা প্রকৃতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কুরআনের আয়াত প্রকাশিত হওয়ার সাথে সাথে তা যেভাবে লিপিবদ্ধ করতেন।

কোরআন নাজিল হওয়ার সময় মুসলমানরা কাঠের উপর নির্ভর করেছিল বলে মসজিদটিতে কাঠের ব্যবহার করা হয়েছে। সোনা রংয়ের মতো দেখতে মসজিদের গম্বুজটি আসলে তামার তৈরি।

জার্মান থেকে থেকে ‘টেকু সোনা’ এনে গম্বুজ তৈরি করা হয়েছে যা দেখতে অনেকটা স্বর্ণের মতো চকচক করে।

যুক্তরাজ্যের অনেক মসজিদই মসজিদের কর্মীদের বেতন দিতে ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদী সরবরাহ করতে পারে না। যুক্তরাজ্যের অধিকাংশ মসজিদে ইমাম ও পরিচালনার জন্য মসজিদ ভবনের পাশাপাশি দুটি ঘর থাকে।

অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আসে।

ভেতরে কাঠের স্তম্ভগুলো যেমন মসজিদের ছাদকে আলোকিত করে তোলে, তেমনি টেকসই কারুকাজ মুসলিম সম্প্রদায়কে ঐক্যের প্রচার কেন্দ্র হিসেবে গৌরবান্বিত করে। যা একেবারেই অদ্বিতীয়।

মসজিদটির চারপাশে হাঁটার সময় কাঠের যে ব্যবহার রয়েছে তা দেখে মনে হয় ডালের মতো গাছগুলো মসজিদের ছাদটি ধরে রেখেছে এবং শিকড়গুলি দেখে সবাই অবাক হয়।

মুসলমানদের বিশ্বাসগুলোকে ভিত্তি আল্লাহ ও তাওহীদের প্রতি বিশ্বাস বাড়িয়ে তোলে। আল্লাহর একত্ব, আল্লাহর অস্তিত্ব ফুটে উঠেছে মসজিদটির অভ্যন্তরে ও বাইরে।

এমন নির্ধারিত একটি উপাসনালয়ের জন্য দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে ক্যামব্রিজের মুসলিমদের। মসজিদটি মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতীক হিসাবে দাড়িয়ে আছে।

প্রকৃতপক্ষে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী, টেকসই যা আল্লাহর গৃহের অবিচ্ছিন্নতা ও আল্লাহর ঘর হিসেবে অস্তিত্ব প্রকাশ করছে। মুসলিম উম্মাহর স্মরণীয় ঘর হিসাবে এটি কাজ করছে।

মসজিদটিতে প্রবেশ করলে অন্যরকম অনুভূতি জাগে। আল্লাহকে স্মরণ করতে মসজিদের যে পরিবেশের বৈশিষ্ট্য থাকে তার সব রয়েছে ক্যামব্রিজের ইকো মসজিদে।

তথ্যসূত্র: ক্যামব্রিজ ইনডিপেনডেন্ট, আল জাজিরা ও বিবিসি

লেখক: মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অনুবাদক
E-mail: [email protected]
ফোন: ০১৮১৩৯৬৫৯৭৮”