মহাবিপদ ডেকে আনছে মহৌষধ এন্টিবায়োটিক

ফাবিহা আক্তার: ওষুধের নামের সাথে ওঁতোপ্রোতভাবে জড়িত যে নামটি তার নাম এন্টিবায়োটিক। বিশ্বব্যাপি এক মহৌষধের নাম এন্টিবায়োটিক। চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলে যে প্রেসক্রিপশন লিখে দেন, তার মধ্যে নিদেনপক্ষে একটি এন্টিবায়োটিক থাকেই তবে সেই কোর্সটি অনেকেই সম্পন্ন করেন না।

এছাড়া ফার্মেসির ঔষুধ বিক্রেতারাও টুকটাক সমস্যায় মানুষকে এন্টিবায়োটিক দিয়ে দেন। কোন বাছ-বিচার না করেই মানুষ এন্টিবায়োটিক গ্রহণ করে থাকে।

তবে অবিবেচকের মতো এসব এন্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে মানবজাতি আরেকটি মহামারির দিকে ধাবিত হচ্ছে। সেটি হচ্ছে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা সুপারবাগ। সহজ ভাষায় এন্টিবায়োটিক যখন কারো শরীরে আর কাজ করে না তখন সেটাকে সুপারবাগ বলে।

সুপারবাগ কী:

সুপারবাগ হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া যা দ্বারা সংক্রমিত হলে অ্যান্টিবায়োটিক আর কাজ করে না। সহজ ভাষায় বলতে পারেন এন্টিবায়োটিক যখন কারো শরীরে আর কাজ করে না তখন সেটাকে সুপারবাগ বলে। অপ্রয়োজনে ও অধিক হারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে এটি হচ্ছে।

এমন সুপারবাগ মানুষের সংখ্যা এখন ভয়াবহভাবে বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ তাদের শরীরে এন্টিবায়োটিক আর কাজ করছে না।
যেসব সাধারণ রোগ এন্টিবায়োটিকে সারে, সুপারবাগের ক্ষেত্রে সে রোগ আর এন্টিবায়োটিকে সারবে না।

তাতে সাধারণ রোগগুলোই মহামারিতে রুপান্তরিত হবে। নিউমোনিয়া ও টাইফয়েডের মতো সাধারণ রোগেই মানুষ প্রাণ হারাবে। বিকল্প আর কোনো চিকিৎসার পথ খোলা নেই বলেই এমন বিপর্যয়ের দিকে যাবে জনস্বাস্থ্য।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে প্রতি ১০০ জনে ৯ শিশুর মধ্যে সবগুলো অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর। এর অর্থ হচ্ছে- তারা পুরোপুরি সুপারবাগ। চট্টগ্রামে মোট ৭ শতাংশ রোগীর শরীরে দেখা গেছে, কোন কোন অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না, মানে কিছুটা সুপারবাগ তৈরি হয়েছে।

বর্তমানে প্রতি চারজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত পুরুষের মধ্যে তিনজনের শরীরই মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্স তথা তিনটির অধিক অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। এভাবেই ধীরে ধীরে আরেকটি মহামারির দিকে অগ্রসর হচ্ছে মানব জাতি।

ইতিহাস থেকে যা জানা যায়:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাজার হাজার সেনাসদস্যের জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন বা অ্যান্টিবায়োটিক এর কল্যাণে। আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯২৮ সালে পেনিসিলিনের সন্ধান পেয়েছিলেন।

এরপর একদল বিজ্ঞানীর অক্লান্ত চেষ্টায়, বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষায় সাফল্য পাওয়ার পর ১৯৪৪ সালে পেনিসিলিন মানুষের ব্যবহার উপযোগী হয়। চিকিৎসকদের হাতে আসে জীবাণু মারার নতুন ওষুধ। কিন্তু এই ওষুধই এখন মানুষ মারার ওষুধ হতে যাচ্ছে।

ফ্লেমিং তাঁর নোবেল পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানেই জীবাণুর মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বা তা থেকে কী বিপদ হতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। সেই সতর্কবাণী শুনল না মানুষ ।

পৃথিবীজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকারিতা। মানুষের দেহে তৈরি হচ্ছে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বা সুপারবাগ।

  • এর কারণ কী?

কোর্স শেষ না করা :

প্রথমত এন্টিবায়োটিক খেলে সেটি শরীরের ক্ষতিকারক জীবাণু মেরে ফেলে। এ পর্যায়ে একটু সুস্থ বোধ করলেই অনেকে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেন। তখন সেই জীবাণুলো এন্টিবায়োটিক প্রতিরোধে সক্ষম হয়ে ওঠে।

অপ্রয়োজনে ব্যবহার :

অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত কিংবা অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার শরীরে অণুজীবগুলোকে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে টিকে থাকার ক্ষমতা তৈরি করে এবং পরবর্তীকালে এই অ্যান্টিবায়োটিক ওই ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীবকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা হারায়। ফলে ওই রোগের চিকিৎসার কোন উপায় থাকে না।

বংশানুক্রমিক সুপারবাগ :

এ ধরনের অণুজীব মা থেকে শিশুতে প্রবাহিত হতে পারে। গর্ভবতী হওয়ার আগে অপ্রয়োজনীয়ভাবে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ এ অকার্যকারিতার কারণ হতে পারে।

গবাদিপশুকে এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ :

পোলট্রি ও গবাদিপশুকে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের কারণে পরবর্তী সময়ে দুধ, মাংস থেকে মানবদেহে প্রবাহিত হতে পারে এ রকম অণুজীব বা অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকারিতার জন্য দায়ী জিন।

শহর এবং গ্রাম উভয় জায়গাতেই বর্তমানে ছড়িয়ে পড়েছে এই অকার্যকারিতা। তবে শহর অঞ্চলে এই অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকারিতার হার অনেক বেশি। এর পেছনে শহরে ফার্মেসির সংখ্যাধিক্য অন্যতম কারণ।

প্রয়োজন ব্যাপক গবেষণা:

দেশব্যাপি হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা ও এর বিভিন্ন প্রকৃতি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন।অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ও অননুমোদিত বিক্রির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কঠোর আইন প্রণয়ন এবং দেশে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার ফার্মেসিকে নজরদারীর আওতায় আনা।

অ্যান্টিবায়োটিক কখন, কেন, কীভাবে, কার পরামর্শে খেতে হবে, তা নিয়ে সরকারি পর্যায়ে নীতিমালা তৈরি এবং ব্যাপকভাবে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে তাতে এর ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *