৮ দিনের জন্য মহাকাশে গিয়ে ৯ মাসে ফেরে তারা

নয় মাসেরও বেশি সময় মহাকাশে আটকে থাকার পর অবশেষে পৃথিবীতে ফিরেছেন মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার দুই নভোচারী। স্পেসএক্সের এক ক্যাপসুলে করে ফেরত আসেন বুচ উইলমোর ও সুনিতা উইলিয়ামস নামের এই দুই মার্কিন নভোচারী।

২০২৪ সালের ৬ জুন এক সপ্তাহের এক মিশনে বোয়িংয়ের স্টারলাইনার ক্যাপসুলে করে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) গমন করেন তারা। তবে প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে নাসা ও বোয়িং সেপ্টেম্বরে খালি অবস্থায় ক্যাপসুলটিকে পৃথিবীতে ফেরত আনে।

৯ মাস আগে মহাকাশে গমনের আগে সুনিতা ও ইউলমোর, ছবি: এবিসি নিউজ

গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় ১১টা ৫ মিনিটে (জিএমটি ৫টা ৫ মিনিট) দুইজনকে নিয়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন আইএসএস থেকে রওনা হয় স্পেসএক্সের ক্যাপসুলটি। ১৭ ঘন্টা পর আজ বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টা ৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার টালাহাসি উপকূলের কাছে সমুদ্রে অবতরণ করেছে স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্যাপসুলটি।

পৃথিবী থেকে ২৫৪ মাইল (৪০৯ কিমি) উপরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস)। প্রায় ২৫ বছর ধরে বিশ্বের নানা দাশের নভোচারীদের আতিথেয়তা দিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া মূলত ফুটবল মাঠের আকারের এই গবেষণাগারটি পরিচালনা করে। এটি বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার একটি মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

মহাকাশে গমনকালে বুচ উইলমোর ও সুনিতা ইউলিয়ামস, ছবি: রয়টার্স

দুই নভোচারীকে ফেরত আনতে যাওয়া স্পেসএক্সের ক্যাপসুলে আরও ছিলেন মার্কিন নভোচারী নিকোলাস হেগ ও রুশ নভোচারী আলেকজান্ডার গর্বুনভ।

দুই নভচারীর পৃথিবীতে আগমনের মধ্য দিয়ে আনন্দের রেশ ছড়ায়। প্রথমেই সুনীতা উইলিয়ামস ও বুচ উইলমোরকে পৃথিবীতে স্বাগত জানায় একঝাঁক ডলফিন। উপকূলে স্পেসএক্স ক্রু ড্রাগন ক্যাপসুল অবতরণের পরেই, সেটিকে ঘিরে ধরে ডলফিনের দল। ঠিক সেই মুহূর্তের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।

পৃথিবীতে ফেরার পর সুনিতাকে স্বাগত জানাচ্ছেন নাসার বিজ্ঞানীরা, ছবি: এনবিসি নিউজ

গত বছর জুন মাসে আট দিনের মিশনে গিয়ে দীর্ঘ নয় মাস মহাকাশে আটকে ছিলেন সুনীতা ও উইলমোর। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শুধুমাত্র সুনীতা ও উইলমোর আটকে পড়েন সেখানে। গত সপ্তাহে তাদের পৃথিবীতে ফেরানোর ঘোষণা দেয় মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ও মহাকাশ বিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স।

আজ বুধবার আটলান্টিকের পানি স্পর্শ করে ক্যাপসুলটি। সেখানেই মোতায়েন ছিল স্পেসএক্সের জাহাজ। একে একে সুনীতারা ক্যাপসুল থেকে বেরিয়ে জাহাজে ওঠেন। তখনই ক্যাপসুলটির চারপাশে একঝাঁক ডলফিনকে লাফিয়ে বেড়াতে দেখা যায়।

পৃথিবীতে পৌঁছানোর পর সুনীতাদের স্বাগত জানায় একঝাঁক ডলফিন, ছবি: এনবিসি নিউজ

বুচ উইলমোর ও সুনিতা উইলিয়ামসদের ফেরার পর আনন্দঘন এমন মুহূর্তে ডলফিনদের সামিল হতে দেখে নাসার বিজ্ঞানীরাও উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। নাসার লাইভ সম্প্রচারে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময়েও ডলফিনদের উপস্থিতির কথা জানানো হয়। উপর থেকে দেখলে মনে হবে, যেন পৃথিবীতে দুই মহাকাশচারীকে স্বাগত জানাচ্ছে ডলফিনরা।

বুচ উইলমোর ও সুনিতা উইলিয়ামস দুইজনই নৌবাহিনীর পরীক্ষামূলক পাইলট ছিলেন। পরে তারা নাসায় যোগ দেন। ৬২ বছর বয়সী উইলমোর টেনেসিতে হাই স্কুল ও কলেজ জীবনে ফুটবল খেলোয়াড় ছিলেন। আর ৫৯ বছর বয়সী সুনীতা ম্যাসাচুসেটসের নিডহ্যামের একজন প্রতিযোগিতামূলক সাঁতারু ও দৌড়বিদ ছিলেন।

এই স্পেসএক্স ক্রু ড্রাগন ক্যাপসুলে করেই পৃথিবীতে ফিরে আসেন সুনিতা ও ইউলমোর, ছবি: নাসা

মহাকাশে থাকাকালীন উইলমোর তার ছোট মেয়ের কলেজের বেশিরভাগ সময় মিস করেছেন। অন্যদিকে, সুনীতা মহাকাশ থেকে ইন্টারনেট কলের মাধ্যমে তার স্বামী, মা ও আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন।

মাসের পর মাস মহাকাশে থাকার ফলে নানা শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় মহাকাশচারীদের। যার মধ্যে রয়েছে পেশী ও হাড়ের ক্ষয়, শরীরে তরলের ঘাটতি যার ফলে কিডনিতে পাথর হতে পারে, দৃষ্টি সমস্যা ও মাধ্যাকর্ষণে ফিরে আসার পরে ভারসাম্য ফিরে পাওয়া।

আজ বুধবার আটলান্টিকের পানি স্পর্শ করে ক্যাপসুলটি, ছবি: এনবিসি নিউজ

এসব সমস্যার জন্য ভালভাবেই দুজনকে প্রস্তুত করেছে নাসা। আইএসএস-এ যাওয়ার তিন মাস পর থেকে সেখানকার কমান্ডার ছিলেন সুনীতা। বাড়ি ফেরার আগের দিন পর্যন্ত তিনি সেই দায়িত্বেই ছিলেন।

উইলমোর ও সুনীতা আইএসএস-এ থাকাকালে পিৎজা, রোস্টেড চিকেন ও চিংড়ির ককটেল খান। ক্রুদের পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ারই শুধু নির্দেশ ছিল। মহাকাশচারীদের সকালে সিরিয়াল, গুঁড়ো দুধ, পিৎজা, রোস্ট চিকেন, চিংড়ি ককটেল ও টুনা খাওয়ার সুযোগ ছিল।

অবতরণের পর সুনিতাকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ছবি: এনবিসি

নাসার চিকিৎসকরা তাদের ক্যালোরি গ্রহণের উপর একটানা নজরদারি করত। ৯ সেপ্টেম্বর নাসা-প্রকাশিত একটি ছবিতে উইলমোর ও  সুনীতাকে আইএসএস-এ খাবার খেতে দেখা যায়। প্রথমে তাজা ফল ও সবজি পাওয়া যেত। কিন্তু তা তিন মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।

সব মাংস ও ডিম আগে থেকে পৃথিবীতে রান্না করা। কেবল গরম করার প্রয়োজন হত। স্যুপ, স্টু ও ক্যাসেরোলের মতো ডিহাইড্রেটেড খাবারগুলোকে আইএসএসের ৫৩০ গ্যালন বিশুদ্ধ পানির ট্যাঙ্কের পানি ব্যবহার করে পুনরায় হাইড্রেট করা হত।

অবতরণের পর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বুচ ইউলমোরকে নেয়া হচ্ছে, ছবি: নাসা

স্টেশনটি মহাকাশচারীদের প্রস্রাব ও ঘাম খাওয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানিতে পরিণত করে পুনর্ব্যবহার করে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সুনীতাদের ওজন কমে যাওয়ার পেছনে খাবারের পরিমাণ কম থাকা নয়। আইএসএস-এ পর্যাপ্ত পরিমাণে খাবার রাখা থাকে।

সূত্র: এবিসি নিউজ, এএফপি, নিউ ইয়র্ক পোস্ট ও নাসা