ভিউস

সিলেট-সুনামগঞ্জ বানভাসীর পাশে তিতাস-দাউদকান্দিবাসী

স্মরণকালেল সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে পুণ্যভূমি খ্যাত সিলেট ও সুনামগঞ্জের লাখ লাখ মানুষ। পানিবন্দী এসব মানুষের মধ্যে খাবার আর সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

এমন অবস্থায় বন্যার্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে কুমিল্লা জেলার তিতাস ও দাউদকান্দি উপজেলার চারটি সামাজিক সংগঠন।

এই চার সংগঠনের যৌথ প্রয়াসে বন্যার্তদের মাঝে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ খাবার পানীয়, ওষুধ ও নারীদের শাড়ি বিতরণ করা হয়েছে।

২৪ জুন সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরীর প্রত্যন্ত এলাকার বন্যাদুর্গত এক হাজারের বেশি পরিবারকে মুড়ি, চিড়া, গুড়, খেজুর।

ছিল ড্রাইকেক, বিশুদ্ধ পানীয়, ওরস্যালাইন, প্যারাসিটামল ঔষধসহ ৪ শতাধিক শাড়ী কাপড় বিতরণ করা হয়, যা অর্থের মূল্যে প্রায় ১০ লাখ টাকা।

লেখক মাইনুল হাসান মাঝে সাংবাদিক মোহাম্মদ রবিউল্লাহ ডানে ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন মামুন

ত্রাণ বিতরণ কাজে সর্বপ্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন তরুণ উদ্যোক্তা ও সরকার ইলেকট্রিক ও তাকওয়া অটো মোবাইলসের স্বত্বাধিকারী বন্ধু ফাহিম সরকার।

ফাহিমের উদ্যোগকে আরো এগিয়ে নিতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করি আমি (মাইনুল হাসান)।

এই উদ্যোগের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত হয় আরেক ব্যবসায়ী বন্ধু ইসমাইল হোসেন মামুন, মাহবুব হাসান সাগর ও চাকুরিজীবী বন্ধু মোবারক হোসেনসহ অন্য বন্ধু ও শুভাকাঙ্খিরা।

ত্রাণ বিতরণে আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করে ব্যবসায়ী বন্ধু ইসমাইল হোসেন মামুন।

স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন মানবতাবাদী মোবারক হোসেন

ত্রাণ বিতরণ প্রসঙ্গে মামুন বলেন, “সিলেট ও সুনামগঞ্জে হঠাৎ করে বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েন সেখানকার মানুষ।

সামাজিক ও গণমাধ্যমের খবরে তাদের দুর্ভোগের কথা শুনে আমরা তাদের সহায়তার উদ্যোগ গ্রহণ করি। ভবিষ্যতেও এই ধরনের কাজ অব্যাহত রাখবো আমরা।”

তরুণ ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা বন্ধু ফাহিম বলেন,  “মানুষের দুঃখ দুর্দশা কিছুটা লাঘব করতে আমরা তিতাস ও দাউদকান্দির ব্যবসায়ীরা বানবাসী মানুষকে সহায়তার উদ্যোগ নিই।

তারই অংশ হিসেবে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছি। খুবই ভালো লাগছে সহায়তা করতে পেরে। তারা খুবই অসহায়ভাবে দিনাতিপাত করছিল।”

চাকুরিজীবী বন্ধু মোবারক বলেন, ‘সারা দেশের মানুষের মতো আমরাও সিলেট-সুনামগঞ্জের বন্যা নিয়ে চিন্তা করেছি। সেই উদ্বেগ কিছুটা লাঘব করতেই বন্যা কবলিত এলাকার মানুষদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ গ্রহণ করি।’

‘প্রবাসীসহ অনেকে আমাদের উদ্যোগে সাড়া দিয়েছিল। খুবই ভালো লাগছে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষদের সহায়তা দিতে পেরে।’

সুনামগঞ্জে পানিবন্দি মানুষের জন্য ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছেন তিতাস দাউদকান্দির স্বেচ্ছাসেবীরা

এছাড়া ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগের সঙ্গী হয় তিতাস উপজেলার জিয়ারকান্দি সমাজ কল্যাণ সংঘ, সাতানি ইউনিয়ন জাগ্রত তরুণ সামাজিক সংঘ, প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্ট ও দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর ইলেকট্রিক মার্চেন্ট এসোসিয়েশন।

সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে সামাজিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ায় এই সামাজিক সংগঠনগুলো। তারই অংশ হিসেবে এবার সুনামগঞ্জের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম হাতে নেয় সংগঠনগুলো।

শুকনো খাবারের মধ্যে ৩০০ কেজি খেজুরও ছিল 

বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ প্রসঙ্গে জিয়ারকান্দি সমাজ কল্যাণ সংঘ’র সাংগঠনিক সম্পাদক আলম সরকার বলেন, মানুষের যে কোন সংকটের সময় আমাদের সংগঠন অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করে।

জিয়ারকান্দি সমাজ কল্যাণ সংঘ’র সভাপতি ফাহিম সরকার ভাই সবার আগে এই উদ্যোগ করলে সবাই তাতে সম্মত হয়ে অর্থ সংগ্রহ শুরু করি। অসহায় বন্যার্তদের সহায়তা করতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।

একই প্রসঙ্গে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে সাতানি ইউনিয়ন জাগ্রত তরুণ সামাজিক সংগঠন এর সভাপতি ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এই বাণীবহন করে আমরা এগিয়ে চলছি।

পানিবন্দি সুনামগঞ্জবাসির জন্য ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা

বানবাসিদের সহায়তায় এগিয়ে যেতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে হচ্ছে। তিতাস থেকে সুনামগঞ্জের দূরত্ব বেশি হওয়ায় এককভাবে আমাদের সংগঠনের পক্ষে ত্রাণ সহায়তা নেয়া সম্ভব না হওয়ায় আমরা চারটি সংগঠন যৌথভাবে যাওয়ার উদ্যোগ নিই। খুবই ভালো লাগছে বলে জানান তিনি।

বন্যা কবলিত মানুষদের সহায়তা করতে যিনি মানসিকভাবে সবাইকে একত্রিত করেছেন তিনি হচ্ছেন প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্ট এর প্রতিষ্ঠা ও সভাপতি রাসেল মুন্সি। তিতাস ও দাউদকান্দি দুই উপজেলার সামাজিক সংগঠনকে তিনি সমন্বয় করে একত্রিত করেন।

ত্রাণ কার্যক্রম প্রসঙ্গে রাসেল মুন্সি বলেন, অসহায়দের সহায়তা করা আমাদের রুটিন মাফিক কাজ। আমরা প্রতিনিয়ত তিতাস ও দাউদকান্দি উপজেলায় অসহায়দের চেষ্টা করে যাচ্ছি। এবার সহায়তা করেছি দূরে সুনামগঞ্জ গিয়ে।

স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে প্রতিবন্ধী কল্যাণ ট্রাস্ট এর প্রতিষ্ঠা ও সভাপতি রাসেল মুন্সি

সামাজিক ও গণমাধ্যমে সিলেট-সুনামগঞ্জের বানবাসি মানুষদের আর্তনাদ মনকে আলোড়িত করেছে। তাই সমমনা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকে একত্রিত করে ত্রাণ দিতে যাই। খুব ভালো লাগছে দুর্দশাগ্রস্তদের সহায়তা করে বলেন রাসেল মুন্সি।

এছাড়া বানবাসিদের সহায়তায় যাদের কথা না বললেই নয় তারা হলেন দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাজারের ব্যবসায়ীরা। তারাও এগিয়ে এসেছেন ত্রাণ বিতরণ কাজে।

সামাজিক যে কোন কাজেই সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে বলে জানিয়েছেন গৌরীপুর ইলেকট্রিক মার্চেন্ট এসোসিয়েশন এর সভাপতি মোশাররফ ভুইয়া ও একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক।

৩০০ কিলোমিটার দূর থেকে গিয়ে বন্যার্তদের সহায়তা করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা

বানবাসিদের ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রমে যারা অর্থিক সহায়তা করেছেন তাদের মধ্যে বন্ধুবর মোহাম্মদ আলমের নামটি বলতে ভুলে গেছি। অসহায়দের সাহায্যে সব সময় পাশে থাকে বন্ধুবর ব্যবসায়ী আলম।

সশরীরে উপস্থিত না থাকলেও ঢাকা থেকে আমাদেরকে মানসিকভাবে সাহস যুগিয়েছেন সাংবাদিক লেখক কলামিস্ট ও অনুবাদক বন্ধু মোহাম্মদ রবিউল্লাহ (রবিউল)।

বন্ধু রবিউল সর্বদা মানুষের কল্যাণে নিবেদিত প্রাণ। সে সাধ্য মতো মানুষকে সহায়তা করে থাকে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজসেবা ও সংস্কৃতি চর্চা করে।

বানবাসিদের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম চলাকালে

উপমহাদেশের মানবতাবাদী সঙ্গীত শিল্পী ভুপেন হাজারিকা সব সময় মানুষের কল্যাণ কামনা করে গান গাইতেন। তিনি মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের মঙ্গল কামনা করে গেছেন।

লেখাটি শেষ করবো জীবনমুখী গায়ক ঞনভুপেন হাজারিকার দুটো গানের কথা দিয়ে।

‘‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে।
একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?
ও বন্ধু…
মানুষ মানুষের জন্য।’’

ত্রাণ সামগ্রী প্রস্তুত করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা

গানে গানে ভুপেন হাজারিকা চলতি শতকে মানুষের মঙ্গলই কামনা করেছেন। যা যুগ থেকে যুগান্তরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকবে।

‘‘মঙ্গল হোক এই শতকে মঙ্গলও সবার।
ঘরে ঘরে শান্তি আনুক সমৃদ্ধি সবার হে..’’
ঊষা কালের সোনালী রোদ পড়ুক আঙ্গিনায়,
অন্ধজন দেখুক এবার নতুন সূর্যোদয় রে….

পরিশেষে আর্থিক, মানসিক ও শারীরিকভাবে অনেকেই সহায়তা করেছেন এই ত্রাণ কার্যক্রমে। তাদের সবার মঙ্গল কামনা করছি।

অতীতের মতো আগামীতেও যেন তারা অন্য জেলার  অসহায় মানুষের পাশে থাকতে পারে। আল্লাহ সবার সহায় হোক।

কলমে: মাইনুল হাসান, সমাজকর্মী ও তরুণ ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা, স্বত্বাধিকারী সরকার ব্যাটারী এন্ড টায়ার ও ত্বাকওয়া অটোমোবাইলস। গৌরিপুর, দাউদকান্দি, কুমিল্লা

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন

পুরস্কার প্রাপ্তি অনুপ্রেরণা ও দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়

৩১ জুলাই রোববার দিনটি আমার জন্য আনন্দের। কারণ এদিন কাজের […]

বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট-গুল খায় আমাদের ফ্ল্যাটের জ্বিন !

রাজধানী ঢাকাতে দীর্ঘদিন সিঙ্গেল ফ্ল্যাটে ছিলাম। ২০২১ সালে ডিসেম্বরে কলিজার […]