মহাকাশের গল্প লিখে ‘বুকার’ জয়

চলতি বছরের বুকার পুরস্কার জিতেছেন ৪৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ লেখক সামান্থা হার্ভে। ‘অরবিটাল’ উপন্যাসের জন্য সাহিত্যজগতের মর্যাদাবান এ পুরস্কারটি পান তিনি। ১২ নভেম্বর লন্ডনে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৪ সালের বুকার পুরস্কার বিজয়ী লেখকের নাম ঘোষণা করা হয়। একইদিন লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। পুরস্কার হিসেবে লেখক সামান্থা হার্ভে ৫০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৬৪ হাজার মার্কিন ডলার) ও আইরিস নামে একটি ট্রফি পেয়েছেন।

বুকার পুস্কারের বিচারক প্যানলের চেয়ারপারসন ও লেখক এডমন্ড ডি ওয়াল বলেছেন, সংক্ষিপ্ত তালিকার ৬টি শক্তিশালী বইয়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ৬ জন কাল্পনিক মহাকাশচারীকে নিয়ে লেখা হার্ভের উপন্যাসটি সর্বসম্মতভাবে বিজয়ী হিসাবে নির্বাচিত হয়েছে। ‘অরবিটাল’ সম্পর্কে আমাদের ঐক্যমত্য এর সৌন্দর্য ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দেয়। বইটিতে আমাদের মূল্যবান ও অনিশ্চিত বিশ্বের প্রতি লেখকের মনোযোগের অসাধারণ তীব্রতা প্রতিফলিত হয়েছে।

কোভিডকালে লকডাউনের সময় ‘অরবিটাল’ বইটির বেশিরভাগ লিখেছিলেন হার্ভে। ‘অরবিটাল’ মহাকাশ নিয়ে লেখা প্রথম কোনো বই, যেটি বুকার পুরস্কার জিতল। ১৩৬ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি ‘বুকার’ জয়ী দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম বই। ১৯৬৯ সালে চালু হওয়ার পর থেকে সামান্থা হার্ভে ১৯তম নারী হিসেবে এই পুরস্কার পেলেন। এ সময়ের মধ্যে ৩৬ জন পুরুষ বিজয়ী হয়েছেন।

‘অরবিটাল’ গত বছরের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের ৬ জন কাল্পনিক নভোচারীকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর বইটি বুকার পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পায়। এরপর থেকে এটির বিক্রি বেড়ে গেছে। বইটি চলতি বছর যুক্তরাজ্যে ২৯ হাজার কপি বিক্রি হয়েছে।

ব্রিটিশ রাণী ক্যামিলার সাথে বুকার পুরস্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত ৬ লেখক, ছবি: স্কাই নিউজ

১৯৭৫ সালে জন্ম সামান্থার। তিনি দর্শনের ছাত্রী। পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ রাইটিং নিয়েও রয়েছে তার ডিগ্রি। হার্ভের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য ওয়াইল্ডারনেস’ ২০০৯ সালে মর্যাদাপূর্ণ এই সাহিত্য পুরস্কারের দীর্ঘ তালিকাভুক্ত ছিল। তার লেখা অন্য বইগুলোর মধ্যে আছে— অল ইজ সং (২০১২), ডিয়ার থিফ (২০১৪) ও দ্য ওয়েস্টার্ন উইন্ড (২০১৮)।

২০১৯ সালের পর হার্ভেই প্রথম নারী যিনি বুকার পুরস্কারে ভূষিত হলেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই বছরের সংক্ষিপ্ত তালিকায় পাঁচজন নারীর বই স্থান পায়। বুকার পুরস্কারের ৫৫ বছরের ইতিহাসে যা সবচেয়ে বড় সংখ্যা৷

যা আছে ‘অরবিটালে’

আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্রে ছয়জন মহাকাশচারীর কাটানো একটি দিনকে বিস্তারিত ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘অরবিটাল’ বইতে। এখানে মহাকাশচারী দুজন পুরুষ ও চারজন নারীর কাহিনী লিপিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক মহাকাশকেন্দ্রে ছয় নভোচারীর পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা, ভিন্ন টাইম জোন জুড়ে থাকা, মহাকাশের আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা নিয়ে লেখা এ গল্পে প্রত্যেকেই বিষয়বস্তু, আবার কেউই বিষয়বস্তু নয়।

লেখকের ভাষ্য

পুরস্কার পাওয়ার পরে হার্ভে এক আশ্চর্য কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এই পুরস্কার আমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি এটি আশা করিনি। যেসব মানুষ পৃথিবীর পক্ষে সরব থাকেন, অন্য মানুষের মর্যাদা, অন্য প্রাণের পক্ষে কথা বলেন এবং যেসব মানুষ শান্তি প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার থাকেন ও কাজ করেন, তাদের সবার জন্য তিনি পুরস্কারের ৫০ হাজার পাউন্ড অর্থ উৎসর্গ করছেন।

চলতি বছরের বুকার পুরস্কারের জন্য মনোনীত সংক্ষিপ্ত তালিকায় হার্ভে ছাড়া আরও ৫ জন ছিলেন। বাকিরা হলেন— ইয়ায়েল ভ্যান ডের উডেন, রাচেল কুশনার, অ্যান মাইকেলস, ​​শার্লট উড ও পার্সিভাল এভারেট।

বুকার পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার জন্য সামান্তা হার্ভেকে অভিনন্দন জানিয়েছে ব্রিটিশ রাজপরিবার। ব্রিটেনের রাজ পরিবারের এক্স অ্যাকাউন্টে রাণী ক্যামিলার একটি বিবৃতি শেয়ার করা হয়। শেয়ার করা হয় সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া অন্য লেখকদের ছবিও।

এর আগে সংক্ষিপ্ত তালিকায় স্থান পাওয়া লেখকরা ব্রিটিশ রানী ক্যামিলার সাথে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। বুকের সংক্রমণে অসুস্থ হওয়ার পর এটি রাণীর প্রথম জনসাধারণের সাথে সাক্ষাৎ।

উল্লেখ্য, বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম মর্যাদাসম্পন্ন পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত বুকার। বিচারক প্যানেল বিগত এক বছরে প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ উপন্যাসকে এই পুরস্কারটি প্রদান করে থাকে। ১৯৬৯ সাল থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এর আগে সালমান রুশদি, কাজুও ইশিগুরো, মার্গারেট অ্যাটউড, অরুন্ধতী রায়ের মতো লেখকেরা মর্যাদাবান এ পুরস্কারটি পান।

অনুবাদ: মোহাম্মদ রবিউল্লাহ
তথ্যসূত্র: সিএনএন, স্কাই নিউজ ও দ্য গার্ডিয়ান