হাত দিয়ে শাটার উঠা নামানোর দিন শেষ


মোহাম্মদ রবিউল্লাহ

প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলছে বিশ্ব। সময়ের সাথে নিজেকে স্মার্টভাবে এগিয়ে নিতে প্রযুক্তির ব্যবহারের জুড়ি মেলা ভার। প্রযুক্তি নির্ভর বিশ্বে দোকান ও শপিং মলের স্ট্যাটাস এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে অটোমেটিক শাটার ডোর। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন সাধারণ ম্যানুয়াল শাটারগুলো হাত দিয়ে উঠানামা করা একদিকে যেমন অনেক কষ্টকর অন্যদিকে বিরক্তিকরও বটে।

হাত দিয়ে শাটার উঠানামার দিন শেষ। বাজারে বেরিয়েছে ইলেকট্রিক অটোমেটিক শাটার ডোর। এ শাটারগুলো হাত দিয়ে উঠানামা করতে হয় না, রিমোট চাপলেই অটোমেটিক্যালি ওপেন ও ক্লোজ হয়। অটোমেশন সিস্টেমের শাটার বা গেটগুলো ম্যানুয়াল সুইচ ও রিমোটের সাহায্যে ৫০০ ফুট দূর থেকেও অপারেট করা যায়।

শাটারগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো সাইজের করে নেওয়া যায়। ৫০ কেজি থেকে ৫ টন ওজনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল শাটার বা গেটও এই সিস্টেমের মাধ্যমে অপারেট করা যায়। অটোমেটিক শাটার বা গেট লাক্সারি শপিংমল, অফিস, হোটেল ও যেকোনো ডেকোরেটিভ প্রতিষ্ঠানের আভিজাত্যের প্রতীক।

বিদ্যুৎ না থাকলে সোলার, আইপিএস ও জেনারেটরের সাহায্যে এগুলো চালানো যায়। অথবা শাটারের সাথে ম্যানুয়াল শিকল রয়েছে যার সাহায্যে কপিকলের মতো করে সেখানে শাটার ওপেন ও ক্লোজ করানো যায় । ব্যবহাারিক দিক দিয়ে সহজ হওয়ায় অনেকে এই ধরনের শাটার ব্যবহার করছেন।

অটো শাটার ডোরের বৈশিষ্ট্য:

  • বিদ্যুৎ চলে গেলেও উচ্চ ক্ষমতার আইপিএস সিস্টেম লাগানো যায়।
  • বিদ্যুতের পাশাপাশি সোলার ও জেনারেটর দিয়েও চালানো যায়।
  • দূর থেকে রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
  • অটো খোলার বা বন্ধ করার জন্য ম্যানুয়াল স্যুইচ থাকে।
  • হাতে খোলা বা বন্ধ করার জন্য ম্যানুয়াল চেইন থাকে।
  • জরুরী স্টপ বাটন থাকে যানবাহন ও মানুষের দ্বারা অপ্রত্যাশিত সমস্যা হলে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসে।
  • যানবাহন ও মানুষ কোনও অসুবিধা ছাড়াই চলাচল করতে পারে।
  • স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম ডিভাইস যুক্ত থাকায় চুরি, ডাকাতি বা অপ্রীতিকর ঘটনা রোধ করে সুরক্ষা নিশ্চিত করে।

বিভিন্ন প্রকার অটোমেটিক শাটার ডোর:

বাজারে বিভিন্ন মান, ধরণ ও বৈশিষ্ট্যের অটোমেটিক শাটার ডোর রয়েছে। যা বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে একেকটি একেক উপাদান দিয়ে তৈরি। এমন কয়েকটি অটোমেটিক শাটার ডোর নিয়ে আলোচনা করা হলো-

হাই স্পিড শাটার:

উচ্চ কর্মক্ষমতা বা উচ্চ গতি সম্পন্ন এ শাটার ঘন ঘন দ্রুত খোলা ও বন্ধ করার মাধ্যমে একটি ভবনের তাপ দক্ষতায় সহায়তা করে। হাই স্পিড শাটারের সর্বাধিক উপকারিতা হল “বায়ু প্রবাহ” নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। বায়ূ প্রবাহের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এটি পুরোপুরি বন্ধ হয় ও খোলে।

অটোমেটিক স্টিল শাটার:

অটোমেটিক গ্যালভানাইজড স্টিল রোলিং শাটার হচ্ছে বাজারের সবচেয়ে সাধারণ রোলিং শাটার দরজা, কারণ এটি শক্তিশালী ও টেকসই। এটি সাশ্রয়ী মূল্যে বেশি নিরাপত্তা প্রদান করে। এই ধরনের অটোমেটিক শাটার ডোরের ডিজাইন ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ও শিল্প ভবনে ব্যবহৃত হয়।

অ্যালুমিনিয়াম এ্যলয় শাটার:

অ্যালুমিনিয়াম এ্যলয় থেকে উচ্চ মানের অটোমেটিক রোলিং শাটার তৈরি হয়। এটি অত্যান্ত শক্তিশালী, নিরাপদ ও মসৃণ বলে আজকাল অনেকে এটি দোকান ও শপিং মলে ব্যবহার করে থাকে। এটি খুবই গুণাগুন সম্পন্ন ওয়েল ফিনিশড শাটার। এটির ডাবল লাইন খাঁজকাটা থাকে ও মুখ বাঁকা।

ফায়ার রেটেড রোলিং শাটার:

ফায়ার রেটেড রোলিং শাটারগুলো দেয়ালের ছিদ্রকে আগুন থেকে সুরক্ষা করে। আগুন বা ভীতিকর ঘটনা ঘটলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ শাটার ডোর বন্ধ করা যায়। ফুসিবল লিঙ্কের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করে নিয়ন্ত্রিত করা যায়। মোটর চালিত ফায়ার রেটেড রোলিং শাটার ৪ ঘন্টা পর্যন্ত স্থিতিশীল ও অখণ্ড থাকে।

ওভারহেড বা সেকশনাল শাটার:

সেকশনাল বা ওভারহেড শাটারগুলো উল্লম্বভাবে উপরের দিকে খোলে। ফলে দরজার সামনে ও পেছনে থাকা পুরো জায়গা অনায়ামে ব্যবহার করা যায়। দোকান ও শপিং ভবনের ভেতরেও দরকারী স্থান নষ্ট হয় না কারণ দরজার অংশগুলো সিলিংয়ের নিচে পার্ক করা যায়। একই সাথে সিলিংয়ের সমান্তরাল বা উল্লম্বভাবে দেয়ালের ট্র্যাকিং কনফিগারেশনের উপর নির্ভর করে। এটি ব্যবহার করলে কোন স্থাপনার সামনের ও পেছনের প্রস্থ পুরোপুরি ব্যবহার করা যায়।

অটোমেটিক পাস ডোর শাটার:

প্রবেশের অন্য কোন উপায় না থাকলে উইকেট দরজা দিয়ে একটি বন্ধ রোলার শাটার দিয়ে বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করার সুযোগ থাকে। একটি রোলিং শাটার ডোর দিয়ে প্রবেশ করা প্রায়ই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষত যখন কোন বিকল্প পথ না থাকে। এক্ষেত্রে “উইকেট ডোর” যখন তখন প্রবেশের সেরা ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প। তবে অতীতে এই ধরনের শাটার দ্বারা সৃষ্ট অভ্যন্তরিণ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার কারণে প্রায়শই দোকান ও বাণিজ্যিক ভবনে ধরনের এই শাটার রাখা হয় না।

অটোমেটিক ট্রান্সপারেন্ট শাটার:

পলি-কার্বনেটের তৈরি এ রোলিং শাটারগুলো দোকান ও শপিং মলের জন্য বিশেষভাবে উপযুক্ত। এটি কাঁচের মতো স্বচ্ছ তবে কাঁচ নয়, এটি অত্যধিক শক্তিশালী বলে ভাঙা খুবই কঠিন। এটি হালকা ওজনের অ্যালুমিনিয়াম থেকে তৈরি করা হয়। এটি অনুপ্রবেশ, চুরি ও ভাঙে না বলে দোকান ও শপিং মলের স্টোরফ্রন্টের জন্য আদর্শ। এপাশ থেকে ওপাশের সবকিছু দেখা যায় বলে এটি খুবই জনপ্রিয়।

অটো গ্রিল রোলিং শাটার:

অটো গ্রিল রোলিং শাটার সম্পূর্ণ বায়ুচলাচলের উপযুক্ত। গ্রিল রোলিং শাটারগুলো আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত কার্যকর ও সম্পূর্ণ সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এ শাটার এমএস,এসএস, মেটাল ও অ্যালুমিনিয়ামের হয়ে থাকে, যা টিউব, স্ল্যাট, গ্রিল এবং প্লেট আকারে তৈরি করা হয়। এটি সৌন্দর্যবর্ধন ছাড়াও চুরিরোধ করে ২৪ ঘন্টা সুরক্ষা দেয়। এটি সাশ্রয়ী ও ব্যবহারিক।

গ্রিল শাটার দরজা হল এক ধরনের রোলিং শাটার যা বাজারে বেশি দেখা যায় এবং স্বচ্ছ এবং সুন্দর হওয়ার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রড শাটার/রিমোট কন্ট্রোল গ্রিলস রোলিং শাটার ডোর ব্যাংক, পার্কিং ওয়ে, বিলাসবহুল দোকানসহ অন্যান্য জায়গায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

এটি বাণিজ্যিক ভবন, ওয়ারহাউসসহ অন্যান্য স্থানেও ব্যবহৃত হয়। ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী, অ্যালুমিনিয়াম এ্যলয় প্লেটের বিভিন্ন বৈশিষ্টের ডোর রয়েছে। যা গ্রাহকের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী টেকসই এবং সুন্দর করে বিভিন্ন আকারে তৈরি করা হয়।

এছাড়াও সাইড কয়েলিং শাটার, স্কাইলাইট রোলিং শাটার, ভার্টিক্যাল রোলিং ডোর, পারফোরেটেড রোলিং শাটার, মোবাইল কন্ট্রোল রোলিং শাটার, হ্যান্ড চেইন রোলিং শাটার, সিকিউরিটি গ্রিলস শাটার, স্টিল অ্যান্ড র‌্যাপিড শাটারও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যবহার করতে দেখা যায়।

ওপেন ও ক্লোজ পদ্ধতি:

অটো শাটার ডোর হাত দিয়ে খোলা যাবে। যাকে বলে ম্যানুয়ালি ওপেন। এর পাশাপাশি বৈদ্যুতিক স্যুইচ দিয়েও ওপেন করা যায়। এছাড়া রিমোট কন্ট্রোল, বোতাম ও ওয়াইফাই এর সহায়তায় অটো শাটার ডোর ওপেন করা ও ক্লোজ করা যায়।

এই শাটারগুলো সাধারণ শাটারের তুলনায় বেশ মজবুত ও ওজনে হালকা হয়ে থাকে। এই শাটারগুলো,দেখতে অনেক সুন্দর । এটি মেশিনের মাধ্যমে রং করা থাকে, যা যেকোনো ইন্টেরিয়র এর সাথে খুব সুন্দরভাবে ম্যাচিং করে।

অটো শাটার ডোরের দরদাম:

অটো শাটারের দাম নির্ভর করে এর ব্যবহারিক সুবিধার ওপর। যত বেশি সুবিধা থাকবে দামও তত বেশি হবে। সুবিধা কম থাকলে দামও কম হবে। স্কয়ার ফিট ও সেট এই দুইভাবে অটো শাটার ডোর বিক্রি হয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি স্কয়ার ফিট ৪৫-৫০ মার্কিন ডলার বা ৩,৮০০-৪,২০০ টাকা। আর অটো শাটার ডোরের সেট সাধারণ ৪৫০-১৬০০ মার্কিন ডলার বা ৩৫,০০০ থেকে শুরু হয়ে ১,৪০,০০০ টাকায় এ ডোর বিকিনিকি হয়ে থাকে। দোকান বা শপিংমলের চাহিদা অনুযায়ী যে কেউ চাইলেই অটো শাটার ডোর ব্যবহার করতে পারবে।

যেভাবে পাওয়া যাবে:

উন্নত বিশ্বে অটো শাটার ডোরের অহরহ ব্যবহার হলেও বাংলাদেশে এর ব্যবহার খুব বেশি দেখা যায় না। ই-কমার্স সাইটে অর্ডার করে এই ডোর আনতে হয়। আলিবাবা, অ্যামাজন, ই বে, রাকুতিন, টাওবাও, ফ্লিপকার্ট ও ওয়ালমার্টে মতো ই কমা্র্স সাইটে অটো শাটার ডোর পাওয়া যাবে।

মূলত বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি ও চীনের অটোমেটিক ডোর আমদানী করে থাকেন। এ ডোরের ব্যবহার খুব বেশি না হওয়ায় কম দেশ থেকেই অটোমেটিক ডো র আমদানী করা হয়। চীনের তৈরি এ শাটারই বেশি জনপ্রিয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অনুবাদক
ই-মেল: starrabiul@gmail.com
মুঠোফোন:০১৮১৩৯৬৫৯৭৮

Leave a Reply