সোশ্যাল মিডিয়াই আফগান নারীদের লাইফলাইন

সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবানের আফগানিস্তানে বলতে গেলে কোথাও নেই নারীরা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি রাস্তায়ও দেখা মেলে না তাদের! কঠোর শরীয়াহ আইন, নৈতিক পুলিশ আর প্রকাশ্য হেনস্তা বা নির্যাতনের কারণে জনসম্মুখ থেকে একপ্রকার উধাও হয়ে গেছে দেশটির ৪৯ দশমিক ৫৩ শতাংশের নারী প্রতিনিধি।

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর এমন নাজুক পরিস্থিতিতে রয়েছে তারা।

কোনো পুরুষ ছাড়া বাইরে না যাওয়া, দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কর্মী হিসেবে কাজ বন্ধ ও পঞ্চম শ্রেণি পর পড়ালেখা নিষেধ করায় একেবারে ঘরবন্দী হয়ে গেছে দেশটির বিশাল জনগোষ্ঠীর একাংশ।

এ অবস্থায় তালেবানের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়েছেন তারা।

সম্প্রতি মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংস্থা সেন্টার ফর ইনফরমেশন রেসিলেন্স জানিয়েছে, ধারাবাহিক নির্যাতনের পরও ঘুরে দাঁড়ানো শুরু করেছেন নারীরা।

যখন তাদের জনসম্মুখে আসতে দেওয়া হচ্ছে না, তখন তারা বেছে নিয়েছে অনলাইন প্লাটফর্ম। বিশেষ করে ফেসবুক ও এক্সে (টুইটার) একত্রিত হয়ে তারা চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে তালেবান শাসনকে।

তবে আফগান উইটনেসের একটি রিপোর্টে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত ঝুঁকি থাকলেও উদ্যোক্তা বিষয়ক আলোচনা, সৃজনশীলতা ও নিজেদের মত প্রকাশের জন্য ইনস্টাগ্রামে খুবই সক্রিয় তারা।

কম্পিউটারে কাজ করছেন এক আফগান নারী, ছবি: এএসইউ ফাউন্ডেশন

ব্যবহারের দিকে আফগানিস্তানে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ইনস্টাগ্রাম। আর একশ নারীর ইনস্টাগাম একাউন্ট বিশ্লেষণ করা দেখা যায়, এর মধ্যে ৮৬টি একাউন্ট খোলা হয়েছে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর।

এ ব্যাপারে ওই একাউন্ট ব্যবহারকারীরা জানান, তালেবানের দমনমূলক নীতির কারণেই এই প্লাটফর্মে এসেছেন তারা।

এদের মধ্যে কাউকে জোরপূর্বক ইউনিভার্সিটি বা কর্মস্থল থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বিশাল অংশকে ঘরবন্দী করে রাখার গোষ্ঠীটির যে ইচ্ছা এর বিকল্প হিসেবে নিজেদের মত প্রকাশ এবং সবাই মিলে কিছু করার জন্যই ইনস্টাগ্রামে একাউন্ট খুলেছেন।

এটিকে আর্থিক লাইফলাইন হিসেবে নারীরা দেখছেন বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

দমনমূলক আইনের বিরুদ্ধে নারীদের প্রতিবাদী পোস্টার, ছবি: এসেম্বলি ডট মালালা

ইনস্টাগ্রামে আফগান নারীরা বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট পোস্ট করেন। এর মধ্যে দৈনিক জীবনযাপন, স্থানীয় ব্যবসা ও অনুপ্রেরণামূলক লেখাই বেশি থাকে। আবার অনেকে হাতে তৈরি পণ্য, জুয়েলারি, পোশাক, মোমবাতিসহ অন্য পণ্যের প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করছে এটিকে।

তাদের মধ্যে ১৮ বছর বয়সী এক নারী রয়েছেন। রিপোর্টে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি। দেশটির উত্তরাঞ্চলের ওই নারী এই প্লাটফর্মের মাধ্যমে ব্রেসলাইট বিক্রি করেন।

নারীদের কাজ থেকে সরাতে তালেবানের কঠোর আইনের কারণে যেখানে শ্রম বাজার বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে অনলাইনের মাধ্যমে নতুন জীবন পেয়েছে বহু পরিবার।

তবে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট দিলেও তাতে ছবি ব্যবহার করেন না অনেক নারী। এর মধ্যে প্রয়োজনে বাইরে যখন যান তখন খুবই সতর্ক থাকেন তারা। কারণ চুন থেকে পান খসলেই খড়গ হস্ত পারে তালেবান।

ইনস্টগ্রাম ব্যবহারকারী নারীরা জানান, পোশাক পরিধানের নিয়ম লঙ্ঘন করায় নারীদের জরিমানা, প্রকাশ্যে মারধর এমনকি আটক করে নৈতিক পুলিশ।

সম্প্রতি রাজধানীর কাবুলের বাইরে একজন নারী ইনফ্লয়েন্সার ছবি তুলতে গেলে তার ক্যামেরা কেড়ে নেয় নৈতিক পুলিশ। অনলাইনে নিজের অভিনয় ও মডেলিংয়ের ছবি শেয়ার করার জন্য ওই নারীকে শেষতক দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছে তালেবান।

ফেসবুক ব্রাউজিং করছেন একজন নারী, ছবি: আরএফইআরএল

যদিও তালেবানের অধীনে নারীদের ব্যবসা করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক অনুমতি রয়েছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ব্যবসা বা চাকরি করতে গিয়ে ব্যাপক বাধার মুখে পড়ছেন তারা।

গোষ্ঠীটি ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বছরেই বন্ধ হয়ে গেছে নারী পরিচালিত অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

একজন নারী জানান, তালেবানের হেনস্তার কারণে ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য হন তিনি। যেখানে ২০ জন নারী কর্মী ছিল তার। বর্তমানে ইনস্টগ্রামের মাধ্যমের পোশাক বিক্রি করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও নারীদের ওপর দমনমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে তালেবান। এটা সহজেই অনুমেয় জনসম্মুখ থেকে অনলাইনে নতুন জীবনের খোঁজ পাওয়া নারীদের টার্গেট করবে গোষ্ঠটি।

শুধু নারীদের টার্গেট করে সবকিছু থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত গোষ্ঠীটির ওপর আরও বেশি চাপ প্রয়োগ করা। যেন নারীরা তাদের স্বাভাবিক কাজকর্মে আবারও ফিরতে পারে।

অনুবাদ: চঞ্চল ঘোষ
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট ও ক্রাইসিস গ্রুপ