অফবিট

সিলিং ফ্যানের দরদাম

মোহাম্মদ রবিউল্লাহ:

বছরের পর বছর ধরে গরমের সময় শীতল বাতাস দিয়ে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয় সিলিং ফ্যান। বিভিন্ন ধরনের সিলিং ফ্যান পাওয়া যায় বাজারে। যার যেমন চাহিদা, সে রকম ফ্যানই বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। একেক রকম ক্রেতার একেক রকম চাহিদা।

সব শ্রেণির ক্রেতার কথা চিন্তা করেই বিভিন্ন ধরনের সিলিং ফ্যান সরবরাহ করেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ক্রেতার চাহিদার কথা চিন্তা করে বিভিন্ন আকারের ফ্যান বাজারজাত করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে নিত্যনতুন নকশাও যোগ হচ্ছে ফ্যানে। সমাজের মধ্যবিত্তের কাছে সিলিং ফ্যানের জুড়ি মেলা ভার। সাধারণত তিন পাখার সিলিং ফ্যানের চাহিদাই বেশি। তবে অনেকে আবার চার, পাঁচ ও আট পাখার ফ্যান ব্যবহার করেন।

আভিজাত্য ও নান্দনিকতার ছোঁয়া:

বর্তমানে শুধু শীতল বাতাস পেতেই নয়, নিজের বাসা ও অফিসকে আভিজাত্যের ছোঁয়া দিতে বাহারি ডিজাইনের ফ্যানও ব্যবহার করেন। সাধারণত বাসা-বাড়ি ও অফিস-আদালতে তিন পাখার ফ্যানই বেশি ব্যবহার করা হয়।

তবে চার, পাঁচ ও আট পাখার ফ্যানে নানা ধরনের কারুকার্য বেশি থাকে। বর্তমানে সাদা, কালো, হালকা বাদামি কিংবা চাঁপা সাদার মধ্যে সোনালি কারুকাজ ও বিভিন্ন নকশার সিলিং ফ্যান পাওয়া যায়, যা অতীতে তেমন একটা দেখা যায়নি।

বাজারের হালচাল:

বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির ৫৬, ৪৮, ৩৬ ও ২৪ ইঞ্চি এই চারটি সাইজের ও বিভিন্ন মডেলের সিলিং ফ্যান পাওয়া যায়। এতে রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী উন্নত মানের বিয়ারিং। রয়েছে অ্যারোডায়নামিক অ্যালুমিনিয়ামের পাখা, শব্দহীন মোটর।

উন্নত মানের ক্যাপাসিটর, ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ পিওর কপার ওয়্যার। এ ছাড়া বিদ্যুৎসাশ্রয়ী, অ্যালুমিনিয়ামের শিটের অ্যারোডায়নামিক ডানায় বাতাস ছড়ায় সবখানে সমানভাবে।

দরদাম:
একেকটির ডিজাইন, রং ও পাখার সংখ্যা ভিন্নতার কারণে দামও ভিন্ন। তাছাড়া দাম অনেকাংশে নির্ভর করে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপরও। আরএফএলের ভিশনের মোট ১৫ টি মডেল রয়েছে সিলিং ফ্যানের। এইগুলোর দাম ২ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা।

এছাড়া সিঙ্গার, ওয়ালটন, গাজী, বিআরবি, প্যারাডাইস, সুপারস্টার, ন্যাশনাল, হ্যামকো, যমুনা, এনার্জি প্যাক, প্রদীপ কোম্পানির ফ্যানের দাম পড়বে ১ হাজার থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকার মধ্যে।

নিচে ছকের মাধ্যমে কয়েকটি ব্র্যান্ডের ফ্যানের সাইজ, দাম ও গ্যারিন্টির বর্ণনা দেয়া হলো-

বলে রাখা ভালো:

এর বাইরেও নানান কোম্পানির অনেক মডেলের সিলিং ফ্যান রয়েছে। নোভানা, টোটাল, স্যামফনি, ম্যাজিক, টিবিএস, তিশা, তুফানসহ আরো অনেক নন ব্র্যান্ডের ফ্যানও পাওয়া যায় তবে এগুলোর দাম ব্র্যান্ডের তুলনায় একটু কম।

বাজারে প্রচলিত ফ্যানগুলোর পাখায় লোহা, স্টিল ও অ্যালুমেনিয়াম এই তিন ধরনের উপাদান থাকে। পাখার ধরনের উপরেও দাম নিরর্ভও করে। লোহার চেয়ে স্টিল ও স্টিলের পাখার চেয়ে অ্যালুমেনিয়ামের পাখার দাম একটু বেশি হয়।

তবে বর্তমানে অধিকাংশ পাখাই অ্যালুমেনিয়াম শিটের তৈরি। আবার শব্দ ও নি:শব্দ এই বৈশিষ্টের উপরেও দাম নির্ভর করে। যে ফ্যানগুলো চলাকালে শব্দ হয় না বা শব্দ কম হয় সেগুলোর দাম একটু বেশি হয়ে থাকে।

ব্যতিক্রম ২৪ ইঞ্চি:

বাজারে ২৪ ইঞ্চির সিলিং ফ্যানও অহরহ পাওয়া যায়র। ২৪ ইঞ্চি সাইজের ফ্যান সাধারণত জায়গা যেখানে কম থাকে সেখানে ব্যবহার করা হয়। যেমন বেলকুনি, কিচেন রুম ও ছোট কক্ষে ২৪ ইঞ্চি সাইজের ফ্যান বেশি ব্যবহার হয়। ১৬০০-২২০০ টাকার মধ্যে ২৪ ইঞ্চি সাইজের সিলিং ফ্যান বিকিনিকি হয় বাজারে।

যত্মআত্তি:

 ফ্যানের পাখায় সাধারণত প্রচুর ধুলা জমে। তাই সিলিং ফ্যানের পাখাগুলো পরিষ্কার রাখতে হয়। সিলিং ফ্যানের পাখার ওপর ও নিচের অংশ নিয়মিত ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করে রাখতে হয়।

 বেশি ময়লা হলে ভেজা কাপড় অথবা স্পঞ্জ দিয়ে পাখাগুলো পরিষ্কার করতে পারেন। পাত্রে কিছুটা সাবানপানি নিয়ে তাতে একটা পরিষ্কার কাপড় কিংবা স্পঞ্জ ভিজিয়ে চিপে নিন। তারপর সেটা দিয়ে ধীরে ধীরে ফ্যানের পাখার দুই পাশ পরিষ্কার করুন।

 খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করতে চাইলে ফ্যানের পাখাগুলো খুলে সেগুলো সাবান পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। কিছু সময় পর পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিন। তবে পাখা খোলা ও লাগানোর কাজটি অবশ্যই সাবধানে করবেন।

 প্রতি মাসে অন্তত একবার হলেও ফ্যান পরিষ্কার করতে হবে কারণ ফ্যানে ময়লা থাকলে এর গতি ধীরে ধীরে কমতে থাকে।

 ফ্যান চলার সময় যদি শব্দ হয়, তাহলে দ্রুত মেকানিকের সঙ্গে কথা বলুন। ফ্যানে শব্দ হওয়া মানেই অস্বাভাবিকতা। অস্বাভাবিকতা নিয়ে বসবাস করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

 ফ্যান কেনার সময় এর ওয়ারেন্টি কিংবা গ্যারান্টির মেয়াদ বুঝে নিন। কেননা এগুলো বুঝে নিলে পরবর্তীতে কোন ধরনের সমস্যা হলে সহজেই সমাধান করা যায়।

 ফ্যান চালালে ফ্যানই চালাবেন আর এসি চালালে এসি। ফ্যান ও এসি একই সঙ্গে না চালানোই ভালো। তাতে ফ্যান ও এসি দুটোই ভালো থাকবে।

 ফ্যান লাগানোর পরে স্ক্রুগুলো ঠিকঠাকমতো আছে কিনা সঠিক জায়গায় সেদিকেও খেয়াল রাখুন তাতে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকবে না।

 পরিষ্কার করার সময় সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে যাহাতে ফ্যানের পাখার ভারসাম্য নষ্ট না হয় তাতে এর কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে এবং অতিরিক্ত শব্দ উৎপাদন হতে পারে।

লক্ষণীয় বিষয়:

  • পাখা যত বড় হবে বাতাস তত বেশি হবে।
  • পাখা লোহা, স্টিল না অ্যালুমেনিয়ামের তা ভালোভাবে দেখি নিন
  • পাখা বেশি হলে ভারসাম্য বজায় থাকে বলে ঝাঁকুনি কম হয় তাই শব্দও কম হয়।

স্পর্শ না করেই নিয়ন্ত্রণ:

জীবনচর্যা ও ঘরের সাজসজ্জাকে পূর্ণতা দেওয়ার জন্য হালে নান্দনিক, নিখুঁত মিশ্রণ, নানা স্টাইলিশ নকশা, উজ্জ্বল রঙ আর উদ্ভাবনী প্রযুক্তির সিলিং ফ্যান ঘরের শোভা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘরকে সাজিয়ে তুলছে জাঁকজমকপূর্ণ শৈলীতে।

অনেকে ঘরের আসবাব বা ঘরের আকৃতির সঙ্গে মানিয়ে ফ্যান ব্যবহার করেন। পাখার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন রকম নকশা। ঘরের মেঝে ও সিলিংয়ের মধ্যবর্তী দূরত্ব কমের ওপর ফ্যানের নকশা নির্ভর করে।

আধুনিক কিছু ফ্যান রিমোর্ট কন্ট্রোল দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা যায়। কোন কোন সিলিং ফ্যানে লাইটও থাকে। এছাড়া ঠান্ডা ও গরম দুই রকম বাতাস দেয় আজব এমন সিলিং ফ্যানও বাজারে পাওয়া যায়।

ফরোয়াড ও রিভার্স দুইভাবে চলে বলে শীতে গরম বাতাস আর গরমে ঠান্ডা বাতাস দেয় বলে পরিবেশেও ভারসাম্য আসে। এ জাতীয় ফ্যান ১৪, ০০০-১৫,০০০ টাকায় বিক্রি হয়।

বাহারি ভারতীয় ও পাকিস্তানি ফ্যান:

দেশীয় ফ্যানের পাশাপাশি ভারতীয় ও পাকিস্তানি সিলিং ফ্যানও বাজারে পাওয়া যায়। তবে দেশীয় কোম্পানিগুলোর তুলনায় দাম অনেক বেশি। যেগুলো চললেও শব্দ হয় না। নীরবে শরীর ও মনকে শীতল করে দেয়। শরীরকে শীতল করা বিদেশি ফ্যানগুলোর দাম এই জন্যই দেশীয়গুলোর চেয়ে বেশি।

আজকাল অনেকে এপার্টমেন্টে ইন্টিরিয়র ডিজাইনের সাথে ম্যাচিং করে ভারতীয় বাহারি রং ও বিলাসবহুল ডিজাইনের সিলিং ফ্যানে ঘর সাজাচ্ছেন। ভারতীয় এই সিলিং ফ্যানগুলো পুরোপুরি ডকু পেইন্টস।

ডকু পেন্টস বলতে বোঝানো হয় গাড়ীতে যে রং করা হয়। ভারতীয় সিলিং ফ্যানগুলো ৪ হাজার ৫০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ২০ হাজার টাকায় বিকিনিকি হয়।

একেকটার কারুকাজ ও ধরণ একেক রকম। হ্যাভেলস, লুমিনাস, বাজাজ, উষা, ওরিয়েন্ট, এশিয়া ব্র্যান্ডের ভারতীয় সিলিং ফ্যান খুবই জনপ্রিয়। যুগ যুগ ধরে বাতাস দিয়ে যাচ্ছে এই ফ্যানগুলো। তবে সময়ের সাথে সাথে বদল হচ্ছে ফ্যানের নকশারও।

ভারতীয় এই ফ্যানগুলো তিন, চার ও আট পাখারও হয়। আট পাখার ফ্যানগুলোর সাথে লাইট ও রিমোট কন্ট্রোল থাকে। এই ফ্যানের বাতাসে শরীর খুবই শীতল হয়। কোন শব্দও হয় না। মনে হয় যেন ঘরে এসি চলছে।

এছাড়া পাকিস্তানি কাশ্মির, পাক পানজাব ও জিএফসি ফ্যানও প্রচুর ব্যবহৃত হয় ড্রোয়িং রুমে। ৬,০০০ টাকা টাকা থেকে ১২ হাজার টাকায় এসব ফ্যান বিকিনিকি হয়।

এগুলোর সাধারণত কালার ঝলছে যায় না, বা মরিচাও ধরে না। তবে বাতাসের দিক ও ডিজাইনের দিক দিয়ে ভারতীয় ও পাকিস্তানি ফ্যানগুলো খুবই বাহারি ও অভিজাত দেখা যায়।

তবে এতো সুবিধা থাকা সত্বেও বিদেশি সিলিং ফ্যানগুলোর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যেমন ভারতীয় ও পাকিস্তানি সিলিং ফ্যানগুলোতে গ্যারান্টি দেয়া হয় না। আর গ্যারান্টি দিলেও তা মাত্র ১, ২ বছরের গ্যারান্টি দেওয়া হয়। তবে সেই তুলনায় দেশীয় কোম্পানিগুলোর ফ্যান ৫, ৭ ও ১০ কোন কোন কোম্পানি ১২ বছরেরও গ্যারান্টি দিয়ে থাকে।

প্রাপ্তিস্থান:

রাজধানী ঢাকার নিউমার্কেট, বায়তুল মোকাররম, স্টেডিয়াম মার্কেট, চকবাজার, বসুন্ধরা শপিং মল, যমুনা ফিউচার পার্ক, গুলশান ও নবাবপুর মার্কেটে পাওয়া যাবে বিভিন্ন ডিজাইন ও ওয়াটের ফ্যান। এছাড়া ভিশন, ওয়ালটন, সুপার স্টার, সিঙ্গারের শোরম থেকেও কিনতে পারেন।

লেখক: সাংবাদিক, অনুবাদক ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন