সভরিন বন্ড
ভিউস

সভরিন বন্ড ও বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত

অমৃতা প্রীতি:

বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রায় নেয়া ঋণকে বলা হয় সভরিন বন্ড। আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বাণিজ্য ঘাটতি এবং চলতি হিসাবে বড় ঘটতি তৈরি হলে সভরিন বন্ড ইস্যু করা হয়। আবার বড় কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের মূলধন সংগ্রহের জন্যও এ ধরনের বন্ড ইস্যু করা হয়।

এক দশক আগে বাংলাদেশে সভরিন বন্ড ছাড়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের লক্ষ্যে সভরিন বন্ড ছাড়া নিয়ে কথা ওঠে। সভরিন বন্ড ইস্যু না করার রক্ষণশীল পথে হেঁটেছিল বাংলাদেশ।

স্ট্যান্ডার্ন্ড চার্টার্ড ব্যাংক, যুক্তরাজ্যভিত্তিক লয়েডস ব্যাংক, মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস ও জেপি মরগানসহ বেশ কয়েকটি সংস্থাও দীর্ঘদিন ধরেই সভরিন বন্ড ছাড়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে আসছিল। প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাই তাদের মাধ্যমে বন্ড ইস্যু করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন সরকারকে।

তবে সরকারের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়, এ মুহূর্তে বাংলাদেশের বড় ধরনের কোনো প্রকল্পের জন্য অর্থের প্রয়োজন নেই। এ বন্ড ইস্যু করার সময় এখনো আসেনি। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আলোচনা করা হবে।

দেশের অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সভরিন বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে ঋণ নেয়া হলে এখন তা বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে উঠত। দেশের অর্থনীতি এমনিতেই আমদানিনির্ভর। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও শিল্প কাঁচামালের দাম এখন বাড়তির দিকে। এ ধরনের পরিস্থিতি রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। সভরিন বন্ডের দায় থাকলে এ চাপ বাংলাদেশের জন্য আরো অনেক ভারী হয়ে উঠতে পারত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সভরিন বন্ড অপ্রয়োজনীয়। বাজেটে এর কোনো সহায়তা পাওয়া যাবে না। বাজেটে ঘাটতি হতে পারে যদি কর আদায় না বাড়ানো যায়। সরকার যদি স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ঋণ নেয়ার জন্য বন্ড ইস্যু করতে চায়, সেটা করা যেতে পারে। কিন্তু ফরেন কারেন্সি বন্ড ইস্যু করে লাভ নেই।

দেশের অভ্যন্তরীণ বন্ডের বাজারই এখনো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এখনো সভরিন বন্ড ছাড়ার উপযুক্ত হয়ে ওঠেনি সেখানে সভরিন বন্ড ছাড়ার কল্পনা করা বৃথা। সহজ শর্তে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ঋণ পেলে সেটি অপেক্ষাকৃত ভালো বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

এক দশক আগে আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারে সভরিন বন্ড ছেড়ে বিপুল সাড়া পেয়েছিল শ্রীলংকা। ২০০৭ সালে ৫০ কোটি ডলার মূল্যের বন্ড ছেড়ে দেড়শ কোটি ডলারের বেশি ক্রেতা পেয়েছিল দেশটি। এর পর থেকে সভরিন বন্ডের ওপর ভিত্তি করেই বিকশিত হয়েছে দ্বীপরাষ্ট্রটির অর্থনীতি। আবার দেশটির অভ্যন্তরীণ আয় এ বন্ডের ঋণ বা ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ঋণ শোধ করতে না পেরে বাজারে নতুন বন্ড ছেড়েছে শ্রীলংকা। এভাবেই এক দশক ধরে নতুন বন্ড ছেড়ে পুরনো বন্ডের সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে দেশটিকে। শেষ পর্যন্ত সভরিন বন্ডের এ ফাঁদই শ্রীলংকাকে টেনে নিয়েছে দেউলিয়াত্বের দিকে।

সভরিন বন্ডের ফাঁদে বিপর্যয়ের আরেক বড় নজির গ্রিস। ২০০৮-পরবর্তী সময়ে দেশটিতে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় শুরু হয়েছিল, তা এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। শুধু শ্রীলংকা বা গ্রিস নয়, সভরিন বন্ডের ঋণের প্রলোভনে পা বাড়িয়ে বিপর্যয় ঘটেছে আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়াসহ বিশ্বের আরো অনেক দেশের।

Leave a Reply

আরও পড়ুন

নারী

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব আঘাত করছে নারীকে

নীলাঞ্জনা বিথি: জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব আঘাত করছে নারীকে। দূষিত […]