আবিষ্কার

রোবট তৈরি করলেন লালমনিরহাটের হাবিব

হোটেল ও রেস্টুরেন্টে সব ধরনের কাজ করতে সক্ষম এমন রোবট আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন দেশের উত্তরের জনপদ লালমনিরহাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজছাত্র আহসান হাবিব।

 

আহসান হাবিব লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার ইউনিয়নের মানিক বাজার এলাকার সুন্দ্রাহবি গ্রামের মৃত মজু মিয়ার ছেলে। কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির মানবিক শাখার ছাত্র হাবিব।

দুই বছর কঠোর পরিশ্রম:

দীর্ঘ ২ বছরের গবেষণা করে আবিষ্কার করেন এই রোবটটি। এটি রেস্টুরেন্টের সব কাজ করতে পারে। এমনকি বলতে পারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ দেশের অনেক মন্ত্রী-এমপির নামও।

আহসান হাবিব ও তার তৈরি রোবট

এছাড়াও বাংলা ও ইংরেজিতে যে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে। হাত দিয়ে ভারী জিনিসপত্র বহন করতে ও হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে পারেও হাবিবের তৈরি রোবটটি।

ছোটবেলা থেকেই তথ্য প্রযুক্তির ওপর ঝোঁক ছিল হাবিবের। নতুন কিছু আবিষ্কারের নেশায় তথ্য প্রযুক্তিতে বেশ বিচরণ করতো সব সময়। তবে দারিদ্রতার কারণে বড় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হয়নি বিজ্ঞান মনস্ক হাবিবের।

মেলায় প্রথম স্থান অর্জন:

২০১৭ সালে তুষভাণ্ডার আর এমএমপি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় অধ্যায়নরত অবস্থায় বিদ্যালয়ের খরচে কাঠ দিয়ে হাবিবের একটি রোবট বানান হাবিব।

যা ওই সময় লালমনিরহাট জেলা বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি মেলায় প্রথম স্থান অর্জন করে। এতে আবিষ্কারের প্রবণতা আরো বাড়ে হাবিবের।

২০১৮ সালে তার বাবার মৃত্যুতে পরিবারে দারিদ্রতা আরও বেড়ে যায়। তবুও হাল ছাড়েনি তরুণ এই বিজ্ঞানী। লক্ষ্য পূরণে টিউশনি শুরু করেন। সেখান থেকে যা আয় হতো তার একটি অংশ গবেষণার কাজে খরচ করতেন।

শিক্ষক যখন ইউটিউব:

তবে এই ক্ষেত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে সামাজিক মাধ্যম ইউটিউব। ইউটিউব দেখে রেস্টুরেন্টে ও হোটেলে কাজ করতে সক্ষম এমন একটি রোবট আবিষ্কারে প্রচেষ্টা শুরু করে সে।

দিনরাত পরিশ্রম করে এই রোবট তৈরি করেছেন হাবিব

দিনরাত পরিশ্রম করে গত সাপ্তাহে রোবটটির আংশিক আবিষ্কার করে হাবিব। আর্থিক সংকটের কারণে এখনো রোবটির পুরোপুরি কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি হাবিব।

সামনের দিকে এগিয়ে আসা বা পেছনের দিকে দ্রুত যাওয়ার মতো সব করতে সক্ষম করার কাজ চলমান রয়েছে রোবটটির। হাবিবের টাকা সংগ্রহ হলেই আগামী তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে রোবটটি।

হাবিবের প্রতিবেশিদের ভাষ্য:

তার প্রতিবেশিরা জানান, হাবিব যখন এসব যন্ত্র বানাতেন তখন ভেবেছিল বাবা-মায়ের টাকা নষ্ট করছেন। তবে এখন তার সফলতা দেখে তাদের ভুল ধারণা দূর হয়েছে।

হাবিবকে নিয়ে বুক ফুলিয়ে গর্ব করছেন তার প্রতি এলাকাবাসী। জাতীয় পর্যায়ে রোবটটি প্রদর্শনী করার অনুমতি দিয়ে আহসান হাবিবের মেধার মূল্যায়ন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান স্থানীয়রা।

হাবিবের শিক্ষকের কথা:

আহসান হাবিবের এ কাজে প্রথম দিকে প্রতিবেশিরা তাকে পাগল বলতেন তবে এখন তারাই গর্ব নিয়ে কথা বলছেন। তাই শিক্ষার্থীদের মেধাকে মূল্যায়ন করার অনুরোধ করেন ইমান আলী।

হাবিব ছোট থেকেই অনেক মেধাবী ছিল। সব ধরনের পরীক্ষায় প্রথম হতো তবে দারিদ্রতার কারণে বাইরে পড়াশুনা করার সুযোগ পায়নি। তার আবিষ্কারে উৎসাহ দিতে বিত্তবান ও সরকারের প্রতি এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন হাবিবের এই শিক্ষক।

আনন্দিত হাবিবের মা:

হাবিবের বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দারিদ্রতা বেড়ে যায় বলে জানান আহসান হাবিবের মা খালেদা বেগম। হাবিব সারাদিনের ক্লান্তি শেষে তার চিন্তা-ভাবনা তথ্য-প্রযুক্তি ও গবেষণা-আবিষ্কার নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।

প্রত্যন্ত গ্রামে রোবট দেখছে দর্শনার্থীরা

তার পরিশ্রম আজ সফলতা দেখতে শুরু করেছে। বাকি কাজ সম্পন্ন করতে সরকারি সহায়তার অনুরোধ জানান তরুণ বিজ্ঞানী আহসান হাবিবের মা। ছেলের এমন কাজে খুবই আনন্দিত তিনি।

গরীব পরিবারে জন্ম নেওয়া হাবিবের এ কাজে গ্রামের সবাই খুশি। তার এ কাজ গ্রামের সুনাম ও সম্মান বাড়িয়ে দেবে বলে অনেকে আনন্দ করছেন।

হাবিবের পরিবার-পরিজন:

আহসান হাবিব এর বয়স এখন ১৮ বছর। তিন ভাই-বোনের মধ্যে হাবিব সবার ছোট। রোবটটি দেখতে প্রতিদিন তার বাড়িতে উৎসুক জনতা ভিড় করছেন। কারণ রোবটটি মানুষের দেহের সঙ্গে মিলের পাশাপাশি সাবলীল ভাষায় কথার উত্তর দেয়।

হালকা ও ভারী কাজ করতে সক্ষম। অচেনা লোককে মনে রাখা, মানুষের ছবি ও কথা রেকর্ড রাখতে পারা, হ্যান্ডশেক ও অঙ্গভঙ্গিও করতে পারে এ রোবটটি।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতেই এটি তৈরি করেছেন তরুণ নির্মাতা।

স্বপ্ন দেখতাম বাল্যকাল থেকেই:

কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দ্রাহবি গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া আহসান হাবিব নতুন কিছু আবিষ্কারের স্বপ্ন দেখতেন বাল্যকাল থেকেই। কিন্তু বাবা দরিদ্র কৃষক থাকায় তার প্রতিভাকে সঠিকভাবে প্রস্ফুটিত করতে পারছিলেন না।

এর কিছু দিন পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী বাবাকে হারিয়ে তার জীবনে অমানিশা ঘনিয়ে আসতে শুরু করে। পিতাকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন হাবিব।

থেমে যায় তার স্বপ্ন, লেখাপড়ার খরচ চালাতে হিমশিম খান তিনি। শুরু হয় তার কঠিন জীবন সংগ্রাম। তবুও দিশেহারা হয়ে পড়েননি এ স্বপ্নবাজ তরুণ।

প্রতিদিন সকাল ৬ টা থেকে রাত মোট ১২টি টিউশন করেই নিজের পরিবার ও লেখাপড়ার খরচ যুগিয়ে চলেছেন। টিউশনের সামান্য সঞ্চয় ও ধার-দেনা করেই হোটেলের জন্য রোবটটি বানিয়েছেন হাবিব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন

ইসরায়েলে ১ হাজার ২০০ বছর পুরনো মসজিদের সন্ধান

ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলীয় মরুভূমিতে ১২০০ বছর পুরনো একটি প্রাচীন মসজিদের খোঁজ […]

ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিন শেষ!

রাফি সরকার: মরণব্যাধি ক্যানসার নির্মূলে বহুদিন ধরে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রচেষ্টার […]

প্রতিবন্ধীদের হাটার চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কার

সিরাজুম মারফি: প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে প্রতিনিয়ত বিপাকে পড়ছেন তাদের বাবা-মা […]

মাত্র দুই মাসেই খাওয়ার উপযোগী দেশি মুরগি’র উদ্ভাবন

  রুকাইয়া মীম: দেশীয় জার্মপ্লাজম ব্যবহার করে অধিক মাংস উৎপাদনকারী […]