ক্রিটিকস

যেভাবে ক্ষমতা ছেড়েছিলেন পাকিস্তানের ২২ প্রধানমন্ত্রী

আফনান জাহান:
চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম দেশ পাকিস্তান। আচমকা দেশটির সংসদ ভেঙে দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এই পরিস্থিতির কারণেই মূলত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনায় উঠে এসেছে পাকিস্তান।

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই দেশটিতে কোন সরকার প্রধান তার মেয়াদ পুর্ণ করতে পারেননি। হয় পদত্যাগ নয়তো তাকে জোর করে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। কখনো হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে।

কে কিভাবে বিদায় নিয়েছিলেন:

লিয়াকত আলি খান :
১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত মোট ৪ বছর ৬৩ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৫১ সালের ১৬ অক্টোবর এক জনসভায় আততায়ীর গুলিতে প্রাণ হারান তিনি।

খাজা নাজিমুদ্দিন :
১৯৫১ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত মোট এক বছর ১৮২ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। ১৯৫৩ সালের ১৭ আগস্ট পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল মালিক গোলাম তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।

মুহাম্মদ আলি বোগরা:
১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল ক্ষমতায় বসেন বোগরা। মোট দু’বছর ১১৭ দিন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শাসন করার পর তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল ইসকান্দার মির্জা তাকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করেন।

চৌধুরি মুহাম্মদ আলি :
চৌধুরি মুহাম্মদ আলি প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৫৫ সালে। মোট এক বছরের কিছু বেশি সময় পাকিস্তানের মসনদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকার পর ১৯৫৫ সালের ৮ আগস্ট পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা মোহাম্মদ আলিকে পদত্যাগে বাধ্য করেন।

হুসেইন শহীদ সোহরাওয়ার্দী :
১৯৫৬ সালে তিনি ক্ষমতায় বসেন। এক বছর ৩৫ দিন প্রধানমন্ত্রী থাকার পর গভর্নর জেনারেল ইসকান্দারের চাপের মুখে তিনি গদি ছাড়তে বাধ্য হন।

ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দ্রিগার :
পাকিস্তানের ষষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হন ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দ্রিগার। মাত্র দু’মাস পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি। অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়।

ফিরোজ খান নুন :
এরপর দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন ফিরোজ খান নুন। তিনি ২৯৫ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। তাকে গদিচ্যূত করেন ইসকান্দার।

নুরুল আমিন :
এরপর দেশটির অষ্টম প্রধানমন্ত্রী হন নুরুল আমিন।তিনি মাত্র ১৩ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের একমাত্র বাঙালি প্রধানমন্ত্রী।

জুলফিকার আলি ভুট্টো :
১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই পর্যন্ত মোট তিন বছর ৩২৫ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ১৯৭৭ সালের ৫ জুলাই জেনারেল জিয়া-উল-হক ভুট্টোকে ক্ষমতাচ্যূত করেন এবং ভুট্টোকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়।

খান জুনেজো :

ভুট্টোর পর ক্ষমতায় বসানো হয় খান মুহাম্মদ জুনেজোকে। তিনি তিন বছরের কিছু বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন। তাকেও সরিয়ে দেন রাষ্ট্রপতি জিয়া-উল-হক।

বেনজির ভুট্টো :
পাকিস্তানের ১১তম ও প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় আসেন জুলফিকার আলি ভুট্টোর মেয়ে বেনজির ভুট্টো। তিনি প্রায় দু’বছর ক্ষমতায় ছিলেন। বেনজিরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপোষণের অভিযোগ এনে ১৯৯০ সালে রাষ্ট্রপতি ইসহাক তাকে বরখাস্ত করেন।

নওয়াজ শরিফ :
১৯৯০ সালে পাকিস্তানের দ্বাদশ প্রধানমন্ত্রী হন নওয়াজ শরিফ। ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রপতি ইসহাক সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর তিনি গদিচ্যুত হন।

আবার বেনজির:

(ত্রয়োদশ বেনজির ১৯৯৬ সাল থেকে বেনজির ৩ বছর ১৭ দিন ক্ষমতায় ছিলেন।) কিন্তু দ্বিতীয়বারেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ নানান অভিযোগ এনে সরকার ভেঙে দেন রাষ্ট্রপতি ফারুক লেগহারি ।

আবার নওয়াজ :
এরপর আবার ক্ষমতায় আসেন নওয়াজ শরীফ দু’বছর ২৩৭ দিন পর ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অভ্যুত্থানের ফলে তার শাসনকালের অবসান ঘটে।

মীর জাফারুল্লাহ খান জামালি :
এরপরে ক্ষমতায় আসেন মীর জাফারুল্লাহ খান জামালি। তবে প্রায় দু’বছরের শাসনকালের পর সেনাপ্রধান পারভেজ মোশারফের সঙ্গে মতের মিল না হওয়ায় তাকে পদত্যাগের জন্য বাধ্য করা হয় তকে।

সুজাত হোসেন :
পাকিস্তানের ১৬ তম প্রধানমন্ত্রী হন চৌধুরি সুজাত হোসেন। তার শাসনের সময়কাল ছিল মাত্র ৫৭ দিন। এরপর তিনি নিজেই শওকত আজিজকে নিজের পদ ছেড়ে দেন।

শওকত আজিজ :
এরপর প্রধানমন্ত্রী হন শওকত আজিজ। তিনি তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর নিজে থেকেই সরে যান।

ইউসুফ রাজা গিলানি:
এরপর ক্ষমতায় আসেন ইউসুফ রাজা গিলানি। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি মোট চার বছর ৮৬ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। পরে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট তার প্রধানমন্ত্রী পদ খারিজ করে দেন।

পারভেজ আশরাফ:
পাকিস্তানের উনিশতম প্রধানমন্ত্রী হন রাজা পারভেজ আশরাফ। আশরাফ মোট ২৭৫ দিন ক্ষমতায় ছিলেন। তবে ২০১৩ সালে ২৪ মার্চ তিনি তার পদ ছাড়েন।

তৃতীয়বার নওয়াজ :
এরপর ২০১৩ সালে আবার ক্ষমতায় ফেরেন নওয়াজ শরিফ। চার বছর ৫৩ দিন ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৭ সালে পানামা পেপার দুর্নীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাকে ক্ষমতাচ্যূত করে সুপ্রিম কোর্ট। তিনি এখন কারাগারে।

খাকান আব্বাসি :
নওয়াজের পর ৩০৩ দিনের জন্য পাকিস্তানের একুশতম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন শাহিদ খাকান আব্বাসি। তবে ২০১৮ সালে নির্বাচনের মুখে তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ ছাড়তে হয়।

ইমরান খান :
২০১৮ সালের নির্বাচনে জিতে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেন ইমরান খান। নির্বাচনে তার জোট সঙ্গী ছিল মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট পাকিস্তান (এমকিউএম)। পাকিস্তানের ধারা বজায় রেখে ইমরানও মেয়াদ শেষ করতে পারলেন না।

পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান বিরোধীদের পরাজিত করে দাপটের সাথে ইসলামাবাদের মসনদে বসে ছিলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন ইমরান খান থেকে যাবেন। তবে শেষপর্যন্ত তিনিও পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারলেন না। এর আগেই তাকে গদি ছাড়তে হলো।

Leave a Reply