বিশ্বের প্রথম ‘জিরো ওয়েস্ট’ শহর কামিকাতসু

হিমালয় আহমেদ: পৃথিবীর পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ বর্জ্য। বিশেষ করে সমুদ্রের তলদেশে জমা হওয়া প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে অস্তিত্বের হুমকির মধ্যে অনেক জলজ প্রাণী। এমন উদ্বেগের মধ্যে জাপানের এমন একটি শহরের নাম উঠে এসেছে যেটি প্রায় আবর্জনামুক্ত যা ‘‘জিরো ওয়েস্ট ’’ শহর নামে পরিচিতি পেয়েছে। প্লাস্টিক আসার আগে কখনো কারো চিন্তায় ‘‘জিরো ওয়েস্ট’’ বিষয়টি আসেনি। প্লাস্টিকের মাধ্যমে ভয়াবহ রকম পরিবেশ দূষণ পৃথিবীর অনেক মানুষকে সচেতন করেছে। তারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে চিন্তিত ও শঙ্কিত।

প্রচলিত পদ্ধতিতে আবর্জনা পুড়িয়ে, মাটি চাপা দিয়ে কিংবা পানিতে ফেলা এড়িয়ে পুনর্ব্যবহার করার পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়াকে ‘‘ জিরো ওয়েস্ট ” বলা হয়। ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে জাপানে প্রথম জিরো ওয়েস্ট কর্মসূচি হাতে নেওয়ার মধ্য দিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে সূর্যদয়ের দেশের কামিকাতসু শহরটি।

জিরো ওয়েস্ট আন্দোলন শুরু যেখান থেকে:

১৯৮০ সালের দিকে হিপ্পীদের নাম শুনা যায়। তারা অনেকটা বন্য জীবন যাপন করতে চাইতেন। অনেকটা “ফিরিয়ে দাও অরণ্য” টাইপ এর। হিপি (বা হিপ্পি) উপসংস্কৃতি ছিল মূলত ১৯৬০-এর দশকের মধ্যবর্তীকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সংগঠিত একটি যুব আন্দোলন এবং যা বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ‘হিপি’ শব্দটি এসেছে ইংরেজি হিপস্টার থেকে। যারা নিউ ইয়র্ক সিটির গ্রিনিচ গ্রাম এবং সান ফ্রান্সিস্কোর হাইট-আশব্যুরে জেলায় অবস্থান নিতো। হিপ এবং হেপ পদের উৎপত্তি অনিশ্চিত, যদিও ১৯৪০-এর দশকে দুটো পদই আফ্রিকান আমেরিকান জাইভ অপশব্দের অংশ।

২০০৮ সালে জিরো ওয়েস্ট আন্দোলন ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। আন্দোলনকারীরা শপথ নিয়েছে পৃথিবীতে ময়লা আর্বজনা কম ফেলবে। ২০১৬ সালে এসে এটা ভালভাবে পরিচিতি পেয়েছে। উন্নত দেশের মানুষ প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক কেজির কাছাকাছি ময়লা আবর্জনা ফেলে। অনেকে সমষ্টিক হিসাবে আরও বেশীও হতে পারে।

জিরো ওয়েস্ট মুভমেন্ট ভয়াবহ রকম পরিবেশ দূষণ নিয়ে পৃথিবীর মানুষকে অনেক সচেতন করেছে। তারা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়ে চিন্তিত ও শঙ্কিত। এই চিন্তা থেকে তারা কেবলমাত্র প্লাস্টিকের আগে যেভাবে মানুষ চলতো সেই জীবন ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চাচ্ছেন। এ যুগে এ ধরনের কার্যক্রম অত্যন্ত কঠিন। ‘ক্যানসারের জন্য প্লাস্টিক দায়ী’ এ ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তিরা প্লাস্টিক বর্জন করে জিরো ওয়েস্টের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। ধীরে ধীরে জিরো ওয়েস্ট পার্টির জন্য বিশেষ মার্কেট, বিশেষ ব্যবস্থা ও কমিউনিটি গড়ে উঠছে।

বিশ্বের প্রথম ‘‘জিরো ওয়েস্ট’’ শহর:

সবুজ শ্যামল ধানক্ষেত ও বন-পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, জাপানের পশ্চিমাঞ্চলের শিকোকু দ্বীপে অবস্থিত, সবচেয়ে ছোট্ট শহরটির নাম কামিকাতসু। শহরটির আয়তন ১০৯.৬৮ বর্গকিলোমিটার। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১৩ জন। তবে গত কয়েক বছর ধরেই জিরো ওয়েস্ট প্রসঙ্গে বিশ্ববাসীর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে জাপানের ছোট্ট এই শহরটি।

কামিকাতসু শহরটি হতে যাচ্ছে ‘‘ জিরো ওয়েস্ট টাউন ’’। শহরটির বর্জ্য পরিশোধন করে সেসব বস্তু ব্যবহার করা হয় নানান কাজে। কামিকাতসুর জনসংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৫২৯ জন। ২০০৩ সাল থেকে শহরটিতে ময়লা আবর্জনা পরিশোধনের আন্দোলন শুরু হয়। তখন প্রতি বছর আবর্জনা জমা হতো ৫০০ টন। ২০১৬ সালে তার পরিমাণ নেমে এসে দাঁড়ায় ৩০০ টনে। চলতি বছরের শেষে পুরোপুরি বর্জ্যমুক্ত হতে যাচ্ছে কামিকাতসু।

এই শহরের পথে ঘাটে কোথাও নেই ময়লা ফেলার জায়গা। এমনকি শহরটিতে নেই কোনো ময়লার গাড়িও । তবুও কোথাও চোখে পড়বে না এক টুকরো ময়লা আবর্জনা। কারণ এখানকার বাসিন্দারা নিজেরাই তাদের আবর্জনা পরিষ্কার করে নিয়ে আসেন ওয়েস্ট রিসাইকেলিং সেন্টারে। এই সেন্টারে আবর্জনা জমা দিতে কোন কোন ক্ষেত্রে আবর্জনা ধুয়ে শুকিয়েও নিতে হয়।

নেই আবর্জনা সংগ্রহের কর্মী:

মজার বিষয় হলো- জাপানের এই শহরটিতে আবর্জনা সংগ্রহ করার কোনো কর্মীই নেই। শহরের বাসিন্দারা ঘরের ২০ ভাগ আবর্জনা মাটির নিচে পুতে রাখেন আর বাকি ৮০ ভাগ আবর্জনা নাগরিকরা নিজ উদ্যোগে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে দিয়ে আসেন। সেখনে এসব আবর্জনা ৪৫ টি ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়। এরপর সেগুলোকে রিসাইক্লিংয়ের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ময়লা আবর্জনা পরিশোধিত করে পূণঃব্যবহারের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। ফলে সেখানে অনেক সেকেন্ড হ্যান্ড শপ গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন বর্জ্য ও আবর্জনা থেকে নানান ধরনের পণ্য বানানো হয়। আর নাগরিকরাও তা সানন্দে কিনে ব্যবহার করছেন।

কামিকাতসু শহরের ওয়েস্ট কালেকশন সেন্টারে খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, কার্টন, ফ্লায়ারসহ বিভিন্ন ধরনের হালকা কাগজ জাতীয় দ্রব্যের জন্য যেমন আছে নির্দিষ্ট ঝুঁড়ি, তেমনই কঠিন পদার্থ অ্যালুমিনিয়াম, স্প্রে, স্টিল এসবের জন্য ভিন্ন ভিন্ন জায়গা আছে। এমনকি প্লাস্টিক বোতল ও বোতলের ক্যাপের জন্যও আছে আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট জায়গা। মোট ৪৫টি ক্যাটাগরিতে বিভিন্ন বর্জ্যকে সাজাতে হয় কামিকাতসুর বাসিন্দাদের। নিঃসন্দেহে এটি বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে তাদের বেশ সময়ও লেগেছে।

খাপখাওয়াতে বেগ পাওয়া :

কামিকাতসুর স্থানীয়রা কঠিন এমন প্রক্রিয়ার সঙ্গে খাপখাওয়াতে সময় নিয়েছেন কয়েক বছর। একবার অভ্যাস হওয়ার পর এখন আর তেমন সমস্যা হয় না তাদের। এখন তাদের খুব বেশি ভাবতেও হয় না। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় সুনির্দিষ্টভাবে আবর্জনা সাজিয়ে গুছিয়ে রাখাটা এখন তাদের জন্য খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রিসাইকেলিং সেন্টারের কর্মীরা আবর্জনা সাজানোর প্রক্রিয়াটি দেখাশোনা করে থাকেন। ঠিকঠাক জায়গায় ঠিকঠাক আবর্জনা যাচ্ছে কিনা, তা নিশ্চিত করেন তারা। প্রতিটি বস্তুকে সাজানোর জন্য আছে নির্দিষ্ট নীতিমালাও। শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা চর্চায় তাদের জীবন হয়ে উঠেছে দূষণমুক্ত।

২০০৮ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রতিটি বস্তু খুব ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হয় বলে শহরটির ৪০ ভাগ বাসিন্দাই এ পদ্ধতি পছন্দ করতেন না। তবে তাতেও বদলায়নি শহরের আইন। কারণ, বর্জ্য পদার্থ পোড়ানোর জন্য চুল্লি কেনা ও ব্যবহার করার চেয়ে এ পদ্ধতিটি অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। শহরটিতে প্রায় ৮০ ভাগ বর্জ্য পদার্থই রি-সাইকেল করা হয়।

বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে কামিকাতসু:

বর্তমানে জাপানে প্রতিটি ব্যবসা পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সবার আগে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়। আর জাপানের সর্টিং সিস্টেমও বর্তমানে ব্যাপকতার দিক থেকে সারা বিশ্বে অন্যতম। জাপানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ইয়োকোহামার জনসংখ্যা ৩৭ লাখ। সম্প্রতি সেখানকার বাসিন্দাদেরকে ২৭ পাতার একটি ম্যানুয়াল দেওয়া হয়েছে। নতুন এ নীতিমালায় বিস্তারিত বলা হয়েছে, কীভাবে তাদের নিত্যদিনকার বর্জ্যকে ৫০০টি ভিন্ন ভিন্ন ভাগে ভাগ করতে হবে।

কামিকাতসুর রিসাইকেলিং স্টেশনটিকে রি-সাইকেল এক্সচেঞ্জ শপও বলা যায়। শহরের বাসিন্দারা নিয়মিত এখানে এসে তাদের অপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, পছন্দসই জিনিসপত্র বিনামূল্যে বাড়িতে নিয়ে যাবার সুযোগও পান। রাস্তার শেষ মাথার একটি ফ্যাক্টরিতে স্থানীয় এক নারীর ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করেন। যেমন, পুরনো কিমোনোর কাপড় ব্যবহার করে বানানো হয় টেডি বিয়ার। শহরের ৬০ শতাংশ অধিবাসীই নতুন এই পদ্ধতি নিয়ে সন্তুষ্ট। পাশাপাশি ২০২০ সালের মধ্যে জিরো ওয়েস্ট সিটি হবার লক্ষ্য অর্জনেও আশাবাদী। প্রচলিত পদ্ধতিতে, ধানক্ষেত ও চুল্লিতে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য পদার্থ পোড়ানো হতো জাপানে। এখন আর সে অবস্থা নেই।

কামিকাতসুর ঘরে ঘরেই গৃহস্থালি খাদ্য বর্জ্যের ব্যবস্থাপনা:

এছাড়াও, কাঠের চপস্টিক, রান্নার তেল ইত্যাদি পাঠানো হয় বিভিন্ন রিসাইকেলিং কোম্পানিতে। এতে স্থানীয় সরকার যেমন লাভবান হয়, তেমনি এসব ব্যবহার করে তৈরি করা হয় কাগজ কিংবা সারের মতো পণ্য। খাদ্য বর্জ্য প্রসেস করার জন্য ব্যবহৃত হয় স্বল্প পরিসরের হোম-কম্পোস্টিং সিস্টেম। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সহায়তায়, কামিকাতসুর ৯৮ শতাংশ বাড়িতেই জৈব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ থাকায়, শহরটিতে কোনো ধরনের ইন্ডাস্ট্রিয়াল কম্পোস্টিং ব্যবস্থারও প্রয়োজন হয় না। গৃহস্থালি খাদ্য বর্জ্যের ব্যবস্থাপনাও হয়ে যায় কামিকাতসুর ঘরে ঘরেই।
জাপানের অনেক অঞ্চলেই আবর্জনা পৃথকীকরণ প্রক্রিয়া প্রচলিত আছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেসব আবর্জনা বিভক্ত করা হয় গুটিকয়েক ভাগে।

এছাড়াও সব ধরনের গৃহস্থালি আবর্জনা একত্রিত করে চুল্লিতে পোড়ানো হয়। কামিকাতসুর স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ভাবনায়, শহরে যদি আবর্জনা পোড়ানোই না যায়, তাহলে রি-সাইকেল করে ফেলা যাক। এতে খরচ সাশ্রয় হবে। ২০২০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বেশ সফলভাবেই কাজ করে চলেছে কামিকাতসু।

চুল্লি ও ল্যান্ডফিলের ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়া আনতে চায় স্থানীয় প্রশাসন। তবে সেটাই যথেষ্ট না। শহরের বাসিন্দাদের মধ্যে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার কমানোর প্রচেষ্টা না থাকলে জিরো ওয়েস্ট সিটি হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা খুবই কঠিন হয়ে যাবে। শুধু আবর্জনা নিয়ে কাজ করলেই হবে না, আবর্জনার উৎপাদন কীভাবে কমানো যায়, সেটা নিয়েও প্রচুর কাজ করছে কামিকাতসুর প্রশাসন।

কামিকাতসুর পথ অনুসরণ:

২০১৫ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে নগরায়নের চেয়েও দ্রæত গতিতে বেড়ে চলেছে আবর্জনার উৎপাদন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয় যে, ২০২৫ সাল নাগাদ পৃথিবী হবে আরও ১.৪ বিলিয়ন মানুষের আবাসস্থলে পরিণত হবে। সেখানে একজন মানুষ দৈনিক ৩ পাউন্ড করে বর্জ্য উৎপাদন করলে তা বর্তমান বৈশ্বিক বর্জ্য উৎপাদন-মাত্রা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে যাবে। প্রবৃদ্ধির হারে নগরায়নকে বর্জ্য উৎপাদন পেছনে ফেলেছে বহু আগেই।
বিশ্বব্যাপী কামিকাতসুর দেখানো পথ অনুসরণ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে পরিবেশবান্ধব করতে এখন কাজ করছে বেশ কিছু শহর। ২০১৫ সালে স্যান ডিয়েগো তাদের নগর পরিকল্পনায় জিরো ওয়েস্ট সিটি হওয়ার লক্ষ্যে, ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৫ ভাগ ও ২০৪০ সালের মধ্যে শতভাগ সাফল্য অর্জন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। একইভাবে নিউ ইয়র্কও আগামী ১৫ বছরের মধ্যে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

এগিয়ে যাচ্ছে অন্য দেশও:

উচ্চাকাক্সক্ষী স্বপ্ন ছোঁয়ার লক্ষ্যে কাজ করে ইতোমধ্যেই বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে কামিকাতসু। তবে কামিকাতসু ছাড়াও জিরো ওয়েস্ট সিটি হওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে আরও কয়েকটি শহর। বোস্টন ভিত্তিক ওয়েব ম্যাগাজিন সিটি-ল্যাবের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে কয়েক লাখ মানুষ আছে। সেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ বর্জ্য রিসাইকেল করা হয়। স্যান ফ্রান্সিসকোতে ৭০ শতাংশ। এছাড়াও, আমেরিকার বেশ কয়েকটি শহরে এ হার ৭০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ইতালিতেও এখন কামিকাতসুতে ব্যবহৃত পদ্ধতি কাজে লাগানো হচ্ছে। এসব নিয়ে মূলত কাজ করে যাচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলো।

এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সিগুলোর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যেও জিরো ওয়েস্টের কথা জানা যায়, তথ্যানুসারে আমেরিকায় রিসাইকেলিং রেট এখন ৩৪ শতাংশ। ওয়াশিংটন ডিসি শহরে মাত্র ১৬ শতাংশ বর্জ্য রি-সাইকেল করা হয়। এ সমস্যার পেছনে প্রধান কারণ দুইটি। প্রথমত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাজার দখল করে রাখা কোম্পানিদ্বয়ের সিংহভাগ আয় আসে ল্যান্ডফিল থেকে। তাই, ব্যবসার সাথে সাংঘর্ষিক কোনো পদ্ধতিতে তারা আগ্রহী নয়। বর্জ্য পদার্থ মাটি চাপা দেয়ার ব্যবস্থাপনাই ল্যান্ডফিল নামে পরিচিত। আর দ্বিতীয় কারণটি হলো রাজনীতি। রিপাবলিকানরা মনে করে সমুদ্রের উচ্চতা মোটেও বাড়ছে না। বাড়লেও তাদের কিছু যায় আসে না। অন্যদিকে বার্নি স্যান্ডার্স বাদে ডেমোক্র্যাট নেতাদের এসব নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই। এই দুই কারণে আমেরিকায় জিরো ওয়েস্ট বাস্তবায়ন করা যায় না।

ভারতেও মিশন জিরো ওয়েস্ট:

পরিচ্ছন্ন শহরের লক্ষ্যে এবার ‘মিশন জিরো ওয়েস্ট’ শুরু করেছে বাংলাদেশের প্রতিবেশি দেশ ভারত। দেশটির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতার হাওড়ায়। ক্লিন ও গ্রিন সিটির লক্ষ্যে ‘মিশন জিরো ওয়েস্ট এর উদ্যোগ নিয়েছে হাওড়া সিটি কর্পোরেশন। হাওড়ার ডাস্টবিনের উপর থেকে ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতেই এই বিকল্প ভাবনা নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। শহরের কঠিন বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে এই বিকল্প পথ খোঁজা হচ্ছে। শহরের কঠিন বর্জ্য তথা প্লাস্টিক দূষণের বিরুদ্ধেই এই পাইলট প্রজেক্ট তৈরি করা হয়েছে।

ওয়ার্ডের তরুণ সদস্যদের দিয়ে বানোনো হয়েছে গ্রিন ব্রিগেড। দলের সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করে আনবেন। এতোদিন শুষ্ক আবর্জনা বাড়িতে জমিয়ে রেখে আবর্জনার ঝুড়িতে ফেলে দেওয়া হতো, সেই সব একটু কষ্ট করে ডাস্টবিনে ফেলে না দিয়ে গ্রিন ব্রিগেডের হাতে তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়। এইসব কঠিন বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে পলি ব্যাগ, দুধের পাউচ, পেট-জার, খালি ওষুধের শিশি ও পাতা, বাতিল হয়ে যাওয়া ছাতা, জুতা, স্কুল ব্যাগ, পোশাক, বিভিন্ন ই-বর্জ্য ইত্যাদি।

হাওড়া শহরের ৫০ টি ওয়ার্ডের সর্বশেষ জন গণনার তথ্য অনুযায়ী, এখানে ১০.৭৭ লাখ মানুষের বসবাস। বাইরে থেকে প্রতিদিন শহরে আসেন আরও প্রায় ২.৫ লাখ মানুষ। এইসব মানুষের বাসস্থান, কর্মস্থান ইত্যাদি থেকে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ মেট্রিক টন আবর্জনা উৎপন্ন হয়। যা জমা করা হয় হাওড়ার ডাস্টবিনে। বর্তমানে সেই ডাস্টবিনের ধারণ ক্ষমতা প্রায় নিঃশেষিত। এর বিকল্প ব্যবস্থার ক্রমাগত অনুসন্ধান সত্তে¡ও তা এখনও অধরা। এই কারণেই হাওড়া শহরের কঠিন বর্জ্য সমস্যার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সকল বর্জ্যকে কাজে লাগানো হবে। পচঁনশীল বর্জ্যকে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়। বর্জ্য থেকে সার, বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।

পরিবেশ রক্ষায় তিন রিইউজ:

পরিবেশ রক্ষার জন্য তিনটি ‘‘আর” এর প্রয়োজন। তা হল, রিডিউস (দ্রব্যাদির ব্যবহার কমানো), রিইউজ (দ্রব্যাদি পুনরায় ব্যবহার) ও রিসাইক্যাল ( দ্রব্যাদি মাটিতে না ফেলে অন্য সামগ্রী তৈরি করা)। এখনকার জিরো ওয়েস্ট মুভমেন্টের লোকজন ৫টি “আর” ভিত্তি হিসাবে নিয়েছে। তা হলো-
১। রিফিউজ (পরিবেশ নষ্টকারী দ্রব্যাদী ফ্রি দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করা)।
২। রিডিউস (দ্রব্যাদির ব্যবহার কমানো)।
৩। রিইউজ (দ্রব্যাদি পুনরায় ব্যবহার করা)।
৪। রিসাইক্যাল (দ্রব্যাদি মাটিতে না ফেলে অন্য সামগ্রী তৈরি করা)।
৫। রট (অপ্রয়োজনীয় পচঁনশীল দ্রব্য পচিয়ে কম্পোস্ট তৈরি করে মাটিতে ফেলা)।

প্লাস্টিক যুগের আগের জীবন ধারার হাতছানি:

জিরো ওয়েস্ট আন্দোলনের অনেকে আছে যারা রিইউজেবল প্লাস্টিক ব্যবহার করে। অনেকে আছে একদমই প্লাস্টিক ব্যবহার করে না। তারা আরও কট্টরপন্থী। অনেকে আছে অর্গানিক ফসল ছাড়া ক্যামিক্যাল যুক্ত শস্য, সবজি বা ফল খায় না। প্লাস্টিক যুগের আগে যে জীবন ধারা ছিল তা অনেকেই একই জীবন ধারা মেনে চলছেন।
 তারা বাজারে যাচ্ছেন ছোট, বড় বেশ কিছু কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে। তারা সকল দ্রব্যাদি প্লাস্টিকের ব্যাগের পরিবর্তে নিজেদের কাপড়ের ব্যাগে তুলে নিচ্ছেন। যেসব দ্রব্যাদি তরল তার জন্য কিছু কাঁচের বোতল বহন করছে তাতে করে তরল দ্রব্যাদি ক্রয় করছেন।
 স্যানিটারি সামগ্রী সাবান, টুথপেস্ট, লোশন, শ্যাম্পু নিজেরাই অর্গানিক সামগ্রী দিয়ে তৈরি করে কাঁচের কন্টেইনারে রাখছেন। বাঁশের তৈরি টুথব্রাশ ব্যবহার করছেন। কাপড়ের তৈরি স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করছেন। নিজে বাসায় সাবান, শ্যাম্পু, লোশন ও টুথপেস্ট তৈরি করার রেসিপি জিরো ওয়েস্ট পার্টির বøগ ও ইউটিউবে আছে।
 তারা রিইউজের মূলনীতি মেনে পুরাতন কাপড় ব্যবহার করছেন। তারা খুবই কম সংখ্যক কাপড় ব্যবহার করেন। কাপড় ছিঁড়ে গেলেও রিডিউস মূলনীতির জন্য সেলাই করে বার বার পরিধান করছেন। তাদের প্রত্যেকের কাপড়, জুতা ও অন্যান্য সামগ্রী এতো কম থাকে যে তারা যে কোন সময় যে কোন স্থানে দ্রুত বের হতে পারেন।
 কম কাপড় ও বিলাসী সামগ্রী না থাকার কারণে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ সময় কম ব্যয় করতে হয় তারা অনেক সময় পায়। এর অনেক বেড়ায় ও অগানির্ক বাগান করার অনেক সময় পায়।
 তারা পুরাতন ও অল্প সংখ্যক কাপড় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে সরকারী ও বেসরকারি কাজ করে যাচ্ছেন। কাপড় পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে পুনরায় পুরাতন মার্কেটে বিক্রি করে অন্য একটি পুরাতন কাপড় কিনে আনছেন।
 তারা খুব হিসাব করে বাজার করেন যেন কোন কিছু অপচয় না হয়। প্লাস্টিকের বদলে এরা ফ্রিজে সবজি কাঁচের কনটেইনারে বা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে রাখেন। সবজি ও ফল একদম প্রয়োজন না হলে খোসা ছাড়ায় না খোসাসহ তারা রান্না করেন বা খেয়ে ফেলেন। এতে তাদের রান্না ঘরে খুব কম বর্জ্য হয়।
 যাদের বাগান আছে তারা রান্নার বর্জ্য বাগানে কম্পোস্ট বিনে রেখে তাতে কম্পোস্ট করে ফেলেন। যাদের বাগান নেই তারা রান্না ঘরের বর্জ্য ডীপ ফ্রিজে স্টিলের কনটেইনারে জমায় যাতে ঘরের মধ্যে পঁচে না যায় ও দুর্গন্ধ না হয়।
 প্রতিদিন ময়লা ফেলার চেয়ে ফ্রিজে জমিয়ে সাপ্তাহিকভাবে ফেলা কম পরিশ্রমের। তারা তাদের ফ্রিজে জমানো ময়লাগুলো সাপ্তাহিকভাবে যেদিন চাষী বাজারে বাজার বাজার করতে যায় সেদিন সেখানকার কম্পোস্ট বিনে বা প্রতিবেশির কম্পোস্ট বিনে ফেলে আসেন।
 তারা বর্জ্য কমানোর জন্য বড় কাগজ কিনে আগের আমলের মতো খাতা তৈরি করেন। তারা সস্তানদের পুরাতন ক্যালকুলেটর কিনেন। অর্থাৎ তারা সবই পুরাতন সামগ্রী কিনে রিইউজ ফরমুলা মানছেন।
 তারা সমস্ত খাদ্য সামগ্রী কাচের জারে স্টোর করে।
 খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী প্যাকেজিং এ সাধারণত গড়ে ১৫% টাকা কোম্পানিগুলো খরচ করে। এ টাকাটা সম্পূর্ণভাবে আর্বজনা হিসাবে চলে যায়। জিরো ওয়েস্ট পার্টি মনে করে বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে খামোখা বর্জ্য হিসাবে ১৫% টাকা খরচের কোন প্রয়োজন নেই।

জিরো ওয়েস্ট পার্টি অন্যান্য সাধারণ মানুষ থেকে প্রায় ৪০% কম টাকায় জীবন ধারণ করতে পারেন। এটার জন্য খুব যে কষ্ট করতে হবে তা নয়। কেবল জীবন যাপনের প্রক্রিয়াটা বদলাতে হবে। এ টাকায় চলার কারণে এদের ধার কর্জ করতে হয় না। তাদের বড় একটা সেভিং হয়। যার দ্বারা তারা অন্যদের চেয়ে বেশি পরিমাণে বিদেশ ঘুরতে পারেন। পরিবেশ বান্ধব সোলার বিদ্যুৎ সিস্টেম ক্রয় করে নিজেদের ব্যবহারের সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সোলার হতে নিতে পারেন। ব্যাটারি চালিত ও সৌরশক্তির চার্জে চালিত পরিবেশ বান্ধব উন্নত গাড়ী ক্রয় করতে পারে। ইত্যাদি আরও অনেক কাজে তাদের সাশ্রয়ের টাকা খরচ করতে পারে। অনেকেই পলিথিন ও অন্যান্য ব্যাগগুলো পুনরায় ব্যবহার করছে। মানুষ ধীরে ধীরে আরও সচেতন হলে জিরো ওয়েস্ট না পারলেও অন্তত ওয়েস্ট রিডিউসে যাওয়া সম্ভব। এতে পরিবেশ রক্ষা হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কিছুটা কর্তব্য পালন করা হবে। এই জিরো ওয়েস্ট পার্টির পঞ্চম স্তম্ভ অনুসরণ করলে একদিকে জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষা হবে অন্যদিকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে। এছাড়াও মিতব্যয়ীতা ধর্মীয় কাজেরও গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসন।

নগরায়ন ও শিল্পায়নের আগ্রাসনের সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিকাশ ও ব্যবস্থাপনায় উৎকর্ষের স্বপ্নদ্রষ্টাদের জন্য জাপানিজ কামিকাতসু শহরটি নিঃসন্দেহে একটি অনুপ্রেরণার নাম। হয়তো একটু একটু করে এভাবেই একদিন জিরো ওয়েস্ট প্ল্যানেট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ পাবে বিশ্ববাসী।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, টাইমস অব ইন্ডিয়া, রয়ার বাংলা, এমডিতারেক ব্লগ স্পট ডট কম

Leave a Reply