সাহিত্য

বায়না

মন ভালো কিংবা খারাপ থাকুক নিজের মতো করে উপলক্ষ্য তৈরী করে রাত জাগতে আমার ভালো লাগে।
ভোরের আলো গায় মাখানো আমার এক ধরণের নেশা।
কোন ধরণের প্রতিকূল পরিবেশ তৈরী না হলে সকালের পবিত্র সাদা আলো গায়ে লাগাতে শহরের বড় বড় সড়ক অথবা অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াই।
আজকে সকালেও রিক্সাতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম।কিছুটা বৈরী পরিবেশ হলেও মন টানছিল পথের টানে।
মেঘলা সকাল। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি কণা গালে আর হাতের বাহুতে ছুঁয়ে দিচ্ছিলো ।
সকালের মোলায়েম আবহাওয়াতে স্থির এবং চলমান সব কিছুই পরিচ্ছন্ন আর ঝরঝরা থাকে। এমনকি টুংটাং রিক্সার বেলও খুব মিষ্টি লাগে তখন।
এ সময়ে রাস্তায় চলমান সকল পেশার মানুষকে স্নিগ্ধ এবং শান্ত মনে হয়। ঢাকা শহরে সকালে নিত্যদিনের সাধারন দৃশ্য, মা তার সন্তানকে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিচ্ছে।
এই সাধারণ দৃশ্য আমার দেখতে অসাধারণ ভালো লাগে। আমার পাশের রিক্সার এমন দু’জন রাস্তার সিগনালে আমার মতোই দাঁড়িয়ে আছে।
প্রতিকী ছবি
– মা চাপা কন্ঠে তার সন্তানকে গত রাতে শেখানো পড়াগুলোর পুনরাবৃত্তি করাচ্ছেন আর বারবার ছেলেটির পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।
ছেলেটির তেল মাখা চুলে ডান পাশে চিকন সমান রেখায় সিঁথি করা। আমার কেন জানি মনে হল ভদ্রমহিলা সম্ভবত অন্য কোনো সময় হলে চুলেই বারবার হাত বুলিয়ে দিতেন…
এর মধ্যেই, সকালের সাদা আলোতে ধীরে ধীরে হলুদ রং ছড়াচ্ছেন সূর্য মহাশয়। পাশের রিক্সাটি আমাকে অতিক্রম করার সময় মুগ্ধ হয়ে মা ও ছেলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
প্রতিকী ছবি
আমার রিক্সা চলছে। রাস্তার পিঠে রিক্সার চাকা ঘোরা দেখছিলাম। যারা রিক্সায় বসে রিক্সার ঘুর্ণমান চাকায় তাকিয়ে থাকেন তারাই জানেন এটা কেমমন অনুভুতি!
গতরাতের না ঘুমানোর ক্লান্তি অবাধ্য গাধার মতন জোর খাটিয়ে আমার চোখের পাতা জোড়াকে একত্র করে।
তারপর…
নিত্যদিনের অভাবী সংসারের রকমারী কাজকে অপেক্ষায় রেখে কালো বোরখা পরিহিত এক নারী তার ছোট ছেলেকে ৩য় বার্ষিকী পরীক্ষার জন্য রিভাইস করাচ্ছেন আর রাস্তার কিনারা ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছেন।
প্রতিকী ছবি
বোরখা পরিহিতা মহিলা এখন যা রিভাইস করাচ্ছেন তা গতকাল রাত ১২ টার পরেও ছেলেটাকে মুখস্ত করানোর শেষে খাতা কলমে লিখিয়ে ঘুমানোর অনুমতি দিয়েছিলেন।
তবুও তিনি আবার নিশ্চিত হতে চাইছেন-
 : আব্বু, কবিতার আট লাইন এখন বলোতো…
 : কোনটা?
 : ‘আসমানি’-টাই বলো, মনে আছে?
 : এইটা আমি পারিতো..
 : তুমিতো সবই পারো, কিন্তু পরীক্ষার খাতায় কিছু লিখতে পারো না..,
শব্দার্থগুলো ঠিকঠাক মতো লিখবা… প্রশ্ন হাতে পাওয়ার পরপরই ‘রাব্বি শাহলী’… দোয়াটা পড়ে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলে তারপর প্রশ্ন দেখবা..
 : আচ্ছা ঠিক আছে…, আম্মা, একটা কথা বলবো?
 : বলো..  আচ্ছা তার আগে আব্বু ,‘অহংকার’ দিয়ে একটা বাক্য রচনা করে মা’কে শোনাওতো..
প্রতিকী ছবি
: অহংকার পতনের মূল, যদি ভুলে যাই তাহলে লিখবো- ‘আল্লাহ অহংকার করা পছন্দ করেন না’, আম্মা, আমাকে পরীক্ষার পর একটা জিনিস কিনে দিবা?
 : হুম.. হুম.. দিবো, যে ৩০ টা সন্ধি বিচ্ছেদ মুখস্ত করেছ, মনে আছে?
 : আছে, আম্মা বলোনা, একটা জিনিস কিনে দিবা?
 : পড়াশুনার খবর নাই.., এটা কিনে দিবা, ওটা কিনে দিবা…. কি জিনিস?
 : রিয়াদের মতন জুতা কিনে দিবা?.. পায়ে দিয়া হাঁটলে অন্নেক সুন্দর বাতি জ্বলে… আম্মা তুমি জানো না.., অনেক সুন্দর.. অনেক সুন্দর জুতা.. এই জুতা টিভিতেও দেখায়..
বোরখা পরিহিত মহিলা তার সবচাইতে ছোট ছেলেটার হাত ছেড়ে দিয়ে শ্যাম্পু করা মোলায়েম চুলের মধ্যে আলতো করে হাত বোলায়, ছেলেটার কাধে ধরে টেনে আরো কাছে এনে নিজের শরীরের সাথে ঘেষে কিছুটা লম্বা শ্বাস টেনে সমানে তাকায়।
তারা পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। ক্ষণিকের জন্য মনে হয় যেন সারা পৃথিবীর বুকটা মানবশূণ্য, শুধু মাত্র দুটি প্রাণী শূণ্যতার হাহাকারে ভীত হয়ে ঝরোসড়ো হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অজানা গন্তব্যে, বুকে ক্ষীণ প্রত্যাশা তাদের হয়তো অনেক দূরে কোথাও তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
ভদ্র মহিলা আবার কথা বলা শুরু করেন-
 : আব্বু, বাসায় যে স্যার তোমাকে পড়াতে আসে, স্যার কি কিছু বলেছে তোমাদের?
 : হিম, হিম বলেছে, বলেছে
 : কি বলেছে?
 : এবারের পরীক্ষা শেষে আমাকে আর কাজলা’দি কে নিয়ে ঘুরতে যাবে.. আম্মা রিয়াদের মতন বাতি জুতা যদি দাও, ওইটা পরেই যাবো স্যারের সাথে… সবাই তাকায়ে থাকবে আমার দিকে, অনেক সুন্দর বাতি, দিবানা আম্মা?
 : হিম… তোমাদের স্যার কাজলকে টাকা-পয়সা নিয়া কিছু বলছে?
 : ওহ্, বলছে, বলছে.., দিদি’রে বলছে, তোমার মা’কে আমার আগের দু’মাসের আর এ মাসের টাকাটা দিতে বইল্লো,…. আম্মা, স্যারের টাকা খুব দরকার.. বলোনা আম্মা, বাতি জ্বলে ওইটাই.. দিবানা ?
বিকট শব্দে আতঙ্ক নিয়েই চোখ খুলি। বাসের হর্ণ। খুব জেদ ওঠে। ইচ্ছা হয় বাস ড্রাইভারের বসন্তের দাগে ভরপুর গালটাতে কষে বা হাতে পাঞ্জা পেটা করি, আর জিজ্ঞেস করি- ‘শব্দ দূষণ’ নামের যে একটা কথা আছে, তা কখনো শুনেছো?

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন