ভিউস

পিতা হারানো এক পুত্রের আর্তনাদ

জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকার বরিশাল ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক খান রফিক ভাইয়া ও তার সম্মানীত পিতা আব্দুল মোতালেব খান। যিনি একজন নীতিবান শিক্ষক ছিলেন।

শিক্ষার দ্রুতি ছড়িয়েছেন চারপাশে। পিতা হারানো এক সন্তানের আর্তনাত তুলে ধরবো এই লেখনীর মাধ্যমে। কৃর্তিমানের মৃত্যু নেই।

তখন আমি বিএম কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সালটা হবে ২০০৮ বা ২০০৯ হবে। খালাতো বোন রুমা আমার চেয়ে এক বছরের বড়। সে খুব ক্যারিয়ার সচেতন ছিল।

কোনো কাজকে ছোট করে দেখতো না রুমা। ওর কি মনে হলো, একদিন বললো সাংবাদিকতা করবে। যেই কথা সেই কাজ।

বরিশালের প্রথম শ্রেণির একটা পত্রিকায় যোগ দিলো। সেখানে রফিক ভাই ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক। আমাদের ক্যাম্পাসের বড় ভাই সমাজবিজ্ঞান ডিপার্টমেন্টের।

খুব ভালো মানুষ। রুমার মুখে উনার প্রশংসা ও গল্পই শুনতাম। এতো প্রশংসা ও গল্প শুনে উনাকে দেখার খুব ইচ্ছা জাগলো।

একদিন রুমাকে বললাম রফিক ভাইকে দেখবো। উনার সাথে পরিচিত হবো। রুমাও আমার ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দিয়ে নিয়ে ওদের অফিসে নিয়ে যাচ্ছে।

এতো প্রশংসা যার শুনেছি তাকে দেখবো সামনা সামনি। এই জন্য মনে বাড়তি উদ্বেগ ও আনন্দ কাজ করছে। রুমার সাথে অফিসে আসলাম বহু প্রতিক্ষিত ও কাঙ্খিত সেই ভাইকে দেখার জন্য।

রফিক ভাইকে দেখে আমিতো মুগ্ধ, এতো ভালো মানুষ! এতো সহজ সরল! বরিশালে এক নামে সবাই রফিক ভাইকে চিনতো। এতো অল্প বয়সে বাংবাদিকতায় বেশ ভালো শক্ত অবস্থান করে নেন তিনি।

কম বয়সে বেশি যশ ও খ্যাতি অর্জন করলে অহংকারী হয় এমন একটি কথা প্রচলিতআছে আমাদের সমাজে। তবে মনে কোনো রকম অহংকারের লেশমাত্র দেখিনি উনার। আমি রফিক ভাইয়ের ফ্যান হয়ে গেলাম।

বিএম কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী থাকাকালীন রুমা আক্তার ও সালমা খানম

যা হোক, একদিন আমরা সবাই একসাথে খাবো ঠিক করলাম। রফিক ভাইয়ের বন্ধু আরিফ ভাইও খুব ভালো মানুষ। তিনিও তখনকার একজন সিনিয়র সাংবাদিক।

এখন আরো অনেক ভালো অবস্থানে আছেন তিনি। সবার সাথে এখনো খুব ভালো যোগাযোগ আছে। তারাও ফেসবুকের কল্যাণে খোঁজ খবর নেন।

আবার খাবারের দিকেই যাই। সব ঠিক হলো। কোথায় খাবো, কখন খাবো? যেদিন ডেট ঠিক হলো সেদিন আমরা প্রস্তুত। তবে সকাল থেকে রফিক ভাইয়ের খবর নাই।

আমরা চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাইয়া কই? আরিফ ভাইকে কল দিলাম। আরিফ ভাইয়া জানালেন রফিক ভাইয়ের বাবা অসুস্থ। হসপিটালে ভর্তি আছেন।

রফিক ভাই সেটা নিয়ে দৌড়ঝাপের মধ্যে আছেন। আমরা সবাই আপসেট হয়ে গেলাম আঙ্কেলের কথা শুনে। রফিক ভাই পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন।

মাঝে মাঝে খবর নিতাম। কিছুদিন পর আঙ্কেল সুস্থ হয়ে গেলেন। সবাই স্বস্তি পেলাম। আঙ্কেলের অসুস্থতা খবরে সবার মন ভেঙ্গে গেছে বলে একসাথে আর খাওয়া হলো না।

আমি বাবা,মায়ের ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকি। তারা পৃথিবীর সেরা সম্পদ। কারো বাবা-মা অসুস্থ, এটা শুনলে আমার আব্বু-আম্মুর মুখচ্ছবি ভেসে উঠে। উনাদের কথা মনে হয়।

আমার আব্বুও একবার অসুস্থ হয়েছিলেন। তখন বুঝতে পেরেছি বাবা-মা অসুস্থ থাকলে কতোটা কষ্ট লাগে। আমার স্পষ্ট মনে আছে, আব্বু হসপিটালে আছেন, এই ভেবে আমি সারারাত ঘুমাতাম না।

সকাল হলে দৌড়ে হসপিতালে চলে যেতাম আব্বুকে দেখতে। যেই আমি রান্না পারি না। সেই আমি আব্বুর জন্য চেষ্টা করছি রান্না করার, বাসার খাবার খাওয়ানোর। আব্বু বাসায় না আসা পর্যন্ত আমি শান্তি পাচ্ছিলাম না।

আমি বিশ্বাস করি প্রত্যেকটা সন্তানই এমন। নিজের জীবন দিয়ে হলেও বাবা ভালো থাকুক, বেঁচে থাকুক এমন ভাবনাই কাজ করে।

দৈনিক আজকের পত্রিকার বরিশাল ব্যুরো প্রধান খান রফিক

বলছিলাম, এখনো রফিক ভাইয়া,আরিফ ভাইয়াদের সাথে যোগাযোগ হয় ফেসবুকে। অতি সম্প্রতি বারটি ছিল শুক্রবার। রফিক ভাইয়ার একটি ফেসবুক পোস্ট দেখে চোখ আটকে গেল।

কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মনের ভেতর ঝড় শুরু হলো। সবার কমেন্টে বোঝার চেষ্টা করলাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না।

কমেন্টেসে জানার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অবশেষে কল দিয়ে বসলাম ভাইয়ার সেল ফোনে। ভাইয়ার কণ্ঠ শুনেই বুঝলাম হয়তো খারাপ কিছুই হয়ে গেছে।

এইবার আঙ্কেল হয়তো রফিক ভাইয়াকে ছেড়ে চলে গেছেন। এবার আর আটকাতে পারেননি শত চেষ্টা করেও।

রফিক ভাইয়াকে শুধু বলছিলাম ভাইয়া ফেসবুকে দেখলাম আপনার পোস্ট। ভাইয়া ওপাশ থেকে বলে উঠলেন-

“হ্যাঁ সালমা,আব্বা আইসিইউতে ছিলেন ঢাকা মেডিকেলে। আব্বার খুব ইচ্ছা ছিল গ্রামের বাড়ি নলছিটি থাকবেন।

বরিশালে বাড়িতে থাকবেন না। নিয়ে আসলাম। তার পছন্দের জায়গায় রাখলাম। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করলাম আব্বার মনের মতো করে সব কিছু করার।”

ভাইয়ার, কথা শুনে আমি আর কথা বাড়ালাম না। শুধু বললাম, ভাইয়া সব শেষ করেন। পরে কল দিব। ভাইয়া ফোনটা রেখে দিলেন।

আসলে এমন পরিস্থিতিতে কি সান্তনা দিতে হয়, কি বলতে হয় তা আমার জানা নেই। পাখির ডানা ভেঙে গেলে যেমন পাখি ছটফট করে মনে হচ্ছিলো রফিক ভাইয়াও তেমন করছিলেন।

ভাবনায় ছিল একটাই কথা শ্রেষ্ঠ সম্পদ দিয়ে আল্লাহ কেন তা নিয়ে যান। কেন আরও কিছু দিন সুযোগ দেন না তাদের সেবা করার। আমরা যে সেবা করতে চাই।

একদিন পর শনিবার রফিক ভাইয়ার সাথে আবার ফোনে কথা হলো। উনার কাছে অনেক কিছু জানতে পারলাম। কথায় কথায় অনেক অজানা কথা উঠে আসছে ভাইয়ার মুখ থেকে।

উনি অনেকটাই আপসেট হয়ে পড়ছেন। উনার কথার বিপরীতে কিছুই বলতে পারিনি। শুধু শুনে গেছি। আর ভাবছি বলুক যত কথা আছে। হয়তো ভাইয়া একটু হালকা হতে পারবেন।

ভাইয়া বললেন, ‘‘এক ধাক্কায় পথে বসে গেছিরে সালমা! কি বলবো, আমার জীবন তছনছ হয়ে গেছে। এতিম হয়ে গেলাম। আব্বাকে ছাড়া আমি অসহায়, কিভাবে চলবো পথ?’’

ভাইয়া ফোনের ওপাশ থেকে বলছেন ‘‘ আমার ঘরটা খালি হয়ে গেছে রে! একে একে চলে যাচ্ছে, আমার ভয় হয়। প্রচুর ভয় হয়। আব্বারে কত দূর রেখে আসছি। আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবো বলে মনে হয় না। আব্বা একজন শিক্ষকই ছিলেন না, একজন শিক্ষাবিদও ছিলেন।‘‘

‘‘আব্বা কোনদিন দুর্নীতি করেননি। আমাদের জন্য ছোট্ট একটা মাথা গোজার ঠাঁই করে গেছেন। বাবা এক টাকাও ঋণ রাখেননি। আমরা কত ভাগ্যবান বলো? আব্বা আমাদের কত কিছু দিয়ে গেছেন ‘’

সাংবাদিক খান রফিফের বন্ধু সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ

বাবার প্রতি স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে ভাইয়া বলতে লাগলেন ‘‘আব্বা সাইকেলে স্কুলে নিয়ে যেতেন আমাকে। জিলা স্কুলের সামনের অবসর হোটেলে আমার জন্য ১০ টাকা বরাদ্ধ রাখতেন প্রতিদিন। আমরা অনেক কষ্টে বড় হয়েছি।’’

‘আব্বা তবু অসৎ হননি আর আমাদের নীতিতে সব সময় অটল থাকতে বলতেন। আমরা কতদিন আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেয়েছি সেটা গুনে বলতে পারবো না।’’

ভাইয়ার মুখে শুনি তাদের কষ্টে দিনাতিপাতের কথা। তিনি জানালেন যে কোনো কারণে আঙ্কেলকে বরিশাল থেকে বদলি করা হয় সিলেটের জকিগঞ্জ। ওই সময়টি তাদের খুবই কষ্টে কেটেছে।‘’

আঙ্কেলের চলে যাওয়া প্রসঙ্গে ভাইয়া বলতে লাগলেন, ‘বুকের ভেতর কি যে কষ্ট! যদি কাউকে ধরে চিৎকার করে একটু কাঁদতে পারতাম! ’’

আব্বাকে ধরে রাখার জন্য কি না করছি সালমা! ঢাকা মেডিকেলে আইসিইউ পাওয়ার জন্য ডাক্তারের পা পর্যন্ত ধরছি।

অবশেষে স্বাস্থা সচিবের ফোনে আইসিইউ পেলাম, আশা ছিল আব্বা ফিরবেন। আবার আড্ডা দিবো এক সাথে। সেটা হয়ে উঠলো না!

ভাইয়া আরো জানালেন, গভীর রাত থেকে ডাক্তার উনার সঙ্গে কাউন্সিলিং করেছেন, বাস্তবতা বোঝাতে চেয়েছেন বার বার। তখন উনার আশপাশে ২০টি আইসিইউ বেডে যেন ২০টি মৃত্যুকূপ।

ভাইয়ার ভাষায়,

‘আমি ভয়ে কুকরে যাচ্ছিলাম। ডাক্তারদের বললাম, আব্বাকে অনেক আশা করে আনছি। একজন মানুষ গড়ার কারিগরকে বাঁচান প্লিজ। উনারা অপেক্ষা করতে বললেন।

আশেপাশে মৃত্যুপ্রায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আব্বার সঙ্গে কথা বলছি। আব্বার কপালে হাত বুলিয়ে তাকে বার বার বলছি,আব্বা এখনই যাবেন না, আমি মা কে কি জবাব দেব! আব্বা প্লিজ যাবেন না।

আব্বা সাড়া দিয়েছিলেন চোখের পাপড়ি, হাতের আঙ্গুল, আর মুখ দিয়ে গড় গড় করছিলেন!

ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়ে চির নিদ্রায় শায়িত সাংবাদিক খান রফিফের পিতা 

আব্বা হাত ছাড়েনি। যখনই বলতাম আব্বা আমি রফিক, আপনার পাশেই আছি। আপনাকে ছেড়ে যাবো না, কিছুতেই যাবো না! তখনই শক্ত করে হাতটা ধরতেন!

আব্বা বৃহস্পতিবার বিকেল ৪ টার আগেও কথা দিয়েছিলেন যে তিনি যাবেন না। আব্বা যেতে চায়নি বিশ্বাস করো সালমা!

আমি মাকে কি জবাব দেব বলো, এ পর্যন্ত তার সামনে যেতে পারিনি। ২১ টা দিন আব্বাকে নিয়ে যুদ্ধ করছি।

আমি কি করি নি বলো, আব্বা ধরে রাখতে পাড়লাম না। এটা কি আমার ব্যর্থতা? নিজের কাছে নিজেই উত্তর দিতে পারছি না।

সালমা, আব্বার জন্য দোয়ার ব্যবস্থা করছি। তুমি আসো। ভালো লাগবে। এক হাজার মানুষকে খাওয়াবো (নলছিটি)। বরিশালেও ব্যবস্থা করবো। দোয়া করো সালমা ‘’

আল্লাহর একজন পবিত্র মেহমান হয়ে আঙ্কেল ওপারেতে ভালো থাকুন। জান্নাতুল ফেরদৌস হোক আপনার ঠিকানা। অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল।

আর রফিক ভাইয়া,পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে ভালো থাকুন। সবার মাঝে আঙ্কেল থাকবেন আরও কয়েক প্রজন্ম।

আঙ্কেল ছিলেন শিক্ষার দ্রুতি ছড়ানো এক শিক্ষক। কৃর্তিমান মানুষ। কৃর্তিমানের মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন তার অসংখ্য শিক্ষার্থী গুনগ্রাহী ও সন্তানদের মাঝে।

তারপরও কবির ভাষায় বলতে হয়-
“আমি বলি, বলছি দাঁড়াও কীসের এতো তাড়া?
আসলে যে ঘুম আসে না আমার তোমায় ছাড়া।”

বাবারা এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ আমার কাছে। আমাদের কাছে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকা সব বাবাকে মহা রাব্বুল আলামিন সুস্থ রাখুক আর ওপারের বাবাদের জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।

কলমে: সালমা খানম, ইডেন মহিলা কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ও এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রসিডেন্ট ক্রিস্টাল ইন্সুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন

পুরস্কার প্রাপ্তি অনুপ্রেরণা ও দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়

৩১ জুলাই রোববার দিনটি আমার জন্য আনন্দের। কারণ এদিন কাজের […]

বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট-গুল খায় আমাদের ফ্ল্যাটের জ্বিন !

রাজধানী ঢাকাতে দীর্ঘদিন সিঙ্গেল ফ্ল্যাটে ছিলাম। ২০২১ সালে ডিসেম্বরে কলিজার […]