স্বাস্থ্য

দুটি উপায় অনুসরণ করলেই ক্যান্সার ভালো হবে !

রাফসান রণ: ক্যান্সারের নাম শুনলেই মানুষ আঁতকে ওঠে। কারণ এটিকে মরণব্যাধি বলা হয়। তবে রাশিয়ার এক গবেষক ক্যান্সার নিয়ে নতুন তথ্য দিয়েছেন বিশ্ববাসীকে।

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. গুপ্তপ্রসাদ রেড্ডি (বি ভি) বলেছেন, ‘‘ ক্যান্সার কোনো মরণব্যাধি নয়, তবে শুধুমাত্র উদাসীনতার কারণে মানুষ এই রোগে মারা যায় বলে জানান তিনি।

রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর ওশ স্টেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ক্যান্সার গবেষক তিনি। তার মতে, মাত্র দুটি উপায় অনুসরণ করলেই উধাও হবে ক্যান্সার।

উপায়গুলো হচ্ছে:-

১. প্রথমেই সব ধরনের সুগার বা চিনি খাওয়া ছেড়ে দিন। কেননা, শরীরে চিনি না পেলে ক্যান্সার সেলগুলো এমনিতেই বা প্রাকৃতিকভাবেই বিনাশ হয়ে যাবে।

২. এরপর এক গ্লাস গরম পানিতে একটি লেবু চিপে মিশিয়ে নিন। টানা তিন মাস সকালে খাবারের আগে খালি পেটে এই লেবু মিশ্রিত গরম পানি পান করুন। উধাও হয়ে যাবে ক্যান্সার।

আমেরিকার মেরিল্যান্ড কলেজ অব মেডিসিন-এর একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, রাশিয়ার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. গুপ্তপ্রসাদ রেড্ডি যে দুইটি উপায়ের কথা বলেছেন তা কেমোথেরাপির চেয়ে হাজার গুণ ভাল।

ওই গবেষকের মতে, প্রতিদিন সকালে ও রাতে তিন চা চামচ অর্গানিক নারিকেল তেল খাওয়ার অভ্যাস করলে ক্যান্সার সেরে যায় বলেও দাবি করেন তিনি।

চিনি পরিহারের পর নিচের দুটি থেরাপির যেকোনো একটি গ্রহণ করুন। ক্যান্সার আপনাকে ঘায়েল করতে পারবে না। তবে অবহেলা বা উদাসীনতার কোনো অজুহাত নেই।

উল্লেখ্য, ক্যান্সার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে ডা. গুপ্তপ্রসাদ গত পাঁচ বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এই তথ্যটি প্রচার করছেন।

সেই সঙ্গে তিনি সবাইকে অনুরোধ করেছেন এই তথ্যটি শেয়ার করে সবাইকে জানার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।

তিনি বলেছেন, “আমি আমার কাজটি করেছি। এখন আপনি শেয়ার করে আপনার কাজটি করুন এবং আশেপাশের মানুষকে ক্যান্সার থেকে রক্ষা করুন।”

সম্প্রতি, “ওশ স্টেট মেডিকেল ইউনিভার্সিটি, মস্কো, রাশিয়ার ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডা. গুপ্তপ্রসাদ রেড্ডির নামে এক গবেষকের ছবি সম্বলিত একটি তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায় চিনি-মুক্ত খাদ্য, লেবু মিশ্রিত গরম পানি এবং প্রতিদিন সকালে ও রাতে তিন চা চামচ অর্গানিক নারিকেল তেল খেয়ে ক্যান্সার নিরাময়ের দাবিটির বৈজ্ঞানিক কোনো প্রমাণ নেই এবং বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, কিভাবে ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধি, বিস্তার ও মারা যায় এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার সাথে পোস্টগুলোতে প্রচারিত দাবিগুলোর কোন সঙ্গতি নেই।

ওশ স্টেট মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি ও ডা. গুপ্তপ্রসাদ রেড্ডি (বি ভি) নামে টে ওশ স্টেট মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটি রাশিয়ায় নয় বরং কিরগিজস্তানে অবস্থিত এবং ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে ডা. গুপ্তপ্রসাদ রেড্ডি (বি ভি ) কারো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ইন্টারনেটেও এই নামে কোন ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এছাড়াও, আলোচিত পোস্টগুলোতে একজন ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করে হলেও, রিভার্স ইমেজ সার্চ পদ্ধতিতে ছবির ব্যক্তিটির সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, “ডা. গুপ্তপ্রসাদ গত পাঁচ বছর যাবত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এই তথ্যটি প্রচার করছেন”। কিন্তু, ডা. গুপ্তপ্রসাদ এর নামে কোন সোশ্যাল মিডিয়া একাউন্টের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায় না।

চিনি-মুক্ত খাবার না খেলে ক্যান্সার সেল বিনাশ হয়ে যাবে?
কি-ওয়ার্ড সার্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে‘ এর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে “There’s no evidence that following a “sugar-free” diet lowers the risk of getting cancer, or boosts the chances of surviving if you are diagnosed.” অর্থাৎ কোন প্রমাণ নেই যে একটি “চিনি-মুক্ত” ডায়েট অনুসরণ করলে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি কম হয়।

ক্যান্সার কাউন্সিল অস্ট্রেলিয়ার সিইও, অধ্যাপক সানচিয়া আরন্দা এবিসি নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “Stopping sugar getting to cancer cells would also mean that your body’s healthy cells get starved of necessary sugars. I think that would make you lose weight, [and]would make your immune system less efficient and more likely that a cancer would progress.” সুতরাং, চিনি সম্পূর্ণরূপে এড়ানো কখনও কখনও নেতিবাচকভাবেও প্রভাবিত করতে পারে।

এছাড়া, ২০১৬ সালে ‘আমেরিকান ইনস্টিটিউট ফর ক্যান্সার রিসার্চ’ এর প্রকাশিত অনুরূপ প্রতিবেদনেও এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

সিঙ্গাপুর এবং অস্ট্রিয়ার কয়েকজন বিজ্ঞানীর করা কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, উন্নত ক্যালসিয়ামের শর্তে চিনির অনাহারে শুধুমাত্র কিছু ক্যান্সার কোষ মারা যেতে পারে। তবে ক্যান্সার পুরোপুরি ভালো হয়ে যায় এমন কোন তথ্য-উপাত্ত নেই।

কিন্তু, এশিয়ান সায়েন্টিস্টের ২০১৮ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, ‘ভবিষ্যতে একটি নতুন ক্যান্সারের চিকিৎসা বিকাশের জন্য তাদের গবেষণাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে’।

লেবু মিশ্রিত গরম পানি খেলে ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব?
এ বিষয়ে কি-ওয়ার্ড সার্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ন্যাশনাল সেন্টার ফর হেলথ রিসার্চ এর “Do Lemons Prevent Cancer?” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে “the claims that “lemons are a proven remedy against cancer of all types” and “lemons are 10,000 times stronger than chemotherapy” are certainly false.” অর্থাৎ লেবু সব ধরণের ক্যান্সারের বিরুদ্ধে একটি প্রমাণিত প্রতিকার’ এবং ‘কেমোথেরাপির চেয়ে লেবু ১০,০০০ গুণ বেশি শক্তিশালী’ এই দাবিগুলি মিথ্যা।

এছাড়াও, ২০১১ সালে Snopes-এর একটি ফ্যাক্ট-চেক প্রতিবেদনে অনুসন্ধানের ফলাফলের ভিত্তিতে দাবিটিকে মিথ্যা হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

‘ক্যান্সার রিসার্চ ইউকে’ এর ২০১৩ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, “লেবুর রস ক্যান্সার নিরাময় করতে পারে এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।”

এছাড়াও, University of Arkansas for Medical Sciences এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী “The myth significantly exaggerates the potential of lemons and lemon juice as a cancer remedy। The beneficial compounds in lemon juice have shown promise in recent studies, but the levels found in foods may only enhance the body’s ability to fight off cancer. In the end, there is no proven scientific replacement for radiation therapy or chemotherapy.” অর্থাৎ লেবুর রসের উপকারী যৌগগুলো সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রতিশ্রুতি দেখিয়েছে, তবে খাবারে পাওয়া মাত্রাগুলো শুধুমাত্র ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করায় শরীরের ক্ষমতা বাড়াতে পারে কিন্তু শেষ পর্যন্ত, রেডিয়েশন থেরাপি বা কেমোথেরাপির জন্য কোন প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক প্রতিস্থাপন নেই।

প্রতিদিন সকালে ও রাতে তিন চা চামচ অর্গানিক নারিকেল তেল খেলে ক্যান্সার ভালো হয়ে যাবে? এই বিষয়টি নিয়ে কি-ওয়ার্ড অনুসন্ধান করে নির্দিষ্ট কোনো সঠিক গবেষণা পাওয়া যায়নি। তবে কিছু স্টাডিজে দেখা যায় যে যে, কুমারী নারকেল তেল কেমোথেরাপি এর পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া কমাতে পারে এবং নারকেল তেলের একটি উপাদান লাউরিক এসিড যা কোলন ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধি কমাতে পারে। কিন্তু নারকেল তেল ক্যান্সার নিরাময় করে এমন কোনো প্রমাণ নেই।

এ বিষয়ে আমেরিকান সোসাইটি ফর নিউট্রিশন সতর্ক করেছে যে নারকেল তেল কোনো জাদুকরী নিরাময়-সমস্ত বৈশিষ্ট্যসহ অলৌকিক খাবার নয়।

সুতরাং, ডা. গুপ্তপ্রসাদের বরাতে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত চিনি-মুক্ত খাদ্য, গরম লেবু পানি এবং নারকেল তেল খেয়ে ক্যান্সার নিরাময়ের দাবির কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমান নেই, এটি একটি গুজব।

যারা এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছেন তারা ভুল ভাবে এটি উপর আস্থা রেখেছেন চিনিমুক্ত খাদ্য গরম লেবু পানি ও নারিকেল তেল খাওয়া যেতে পারে তবে ক্যান্সার উধাও হবে এমন সিদ্ধান্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

Leave a Reply

আরও পড়ুন

কি কারণে জাপানিদের আয়ু সবচেয়ে বেশি (ভিডিও)

আজমুন ফাবিহা: অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, […]