ভিউস

দায়িত্বের পরেও কিছু কর্তব্য রয়ে যায়

বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণ কালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে সিলেট অঞ্চল। উজানের ঢলে রাতারাতি তলিয়ে যায় মানুষের কৃষি জমি, ঘরবাড়ি।

এতে বহুমানুষ নিহত ও নিখোঁজ হয়। গবাদি পশু-ফল ফসল যে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তার ইয়ত্বা নেই।

সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে যায় মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেটসহ সব ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা।

রেল স্টেশন-বিমানবন্দরের রানওয়ে তলিয়ে রেল ও বিমান পথেও চলাচল বন্ধ হয়।

বন্যা কবলিত সিলেটে চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টার আক্তার হোসেন

বাসে শুধু সিলেট শহর পর্যন্ত যাওয়া গেলেও শহরের ভেতর এবং অন্যান্য জেলা এবং উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থ ভেঙ্গে পড়ে।

এক কথায় দেশের সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সিলেট-সুনামগঞ্জ। মোবাইল ও ইন্টারনেট সংযোগ না থাকায় বন্যা পরিস্থিতির খবরও জানা যাচ্ছিলো না।

সংবাদ কর্মীরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারছিল না। স্থানীয় সংবাদ কর্মীরাও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ফলে বন্যার প্রকৃত চিত্র- মানুষের সামেনে তুলে ধরতে বেশ বেগ পেতে হয় গণমাধ্যমকে।

অনবরত নিউজ কাভার করে যাচ্ছে চ্যানেল আই

এমন সময়- শুক্রবার দুপুরে তাৎক্ষনিক এসাইনমেন্ট এডিটরের এক ফোনে জরুরি ভিত্তিতে সুনামগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেই।

কিন্তু সুনামগঞ্জ অলরেডি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় আমরা প্রথমে সিলেটের দিকে যাওয়ার মনস্থির করি। কিন্তু সেখানেও বাধে বিপত্তি।

বাসে যাত্রী নেই বলে নির্ধারিত বাস ছেড়ে যাবে না। বাধ্য হয়ে পরবর্তী শিডিউলের বাসে করে সিলেট যাই। সিলেট পৌঁছেই নামতে হলো পানির মধ্যে।

সিলেটের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল হুমায়ুন চত্তর পানিতে তলিয়ে গেছে। আমাদের প্রতিনিধি সাকি ভাই আগে থেকেই হোটেল ঠিক করে রেখেছিলেন।

কিন্তু পুরো সড়ক পানিত তলিয়ে থাকায় কোন সিএনজি যেতে চাচ্ছিলো না। গেলেও ভাড়া ৩/৪গুন বেশি।

সাহায্য চাইতে আসছে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষ

এমন সময় আব্দুল আজিজ নামে এক চালক সাহস করে ভিন্ন রাস্তা দিয়ে আমাদের নিয়ে চললেন। কিন্তু পানি থেকে নিস্তার পেলাম না।

সিএনজিসহ পানিতে ডুবে গেলো। বাধ্য হয়ে ক্যামেরা-ব্যাকপ্যাক বাঁচাতে পানিতে নেমে পড়লাম। ক্যামেরা পারসন হাবিব ভাই ও আমি সিএনজি ঠেলে পানির উপরে তুললাম।

পরে চালক নানান কায়দা করে আবার সচল করে আমাদের রাত দেড়টার দিকে হোটেলে পৌঁছে দিল। সিলেটে তখন অনবরত বৃষ্টি হচ্ছে।

সকালে উঠে লাইভ দিতে গিয়ে মহা ঝামেলায় পড়লাম। কারণ এতো বৃষ্টিতে ক্যামেরা সেট করা যাচ্ছিলো না।

পানিতে দাঁড়িয়েই লাইভ করছেন চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টার আক্তার হোসেন

আমরা তো ভিজেই গেলাম। তার ওপর আমি সিলেটের রাস্তাঘাট কিছুই চিনি না। যাইহোক এক সিএনজি চালকের সহায়তায় গেলাম- নগরী ব্যস্ততম সোবহানী ঘাটে।

সেখানে হাটু জলের নিচে তলিয়ে আছে সড়ক। তার পাশেই অভিজাত এলাকা উপশহর কোমড় সমান পানিতে তলিয়ে গেছে।

সিলেট শহরের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে সকাল ৭টা ৮ টা ৯টার লাইভ দেওয়ার পর আমাদের চেষ্টা সুনামগঞ্জ যাওয়ার।

কিন্তু সুনামগঞ্জে যাওয়ার একমাত্র সড়কটি তলিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। নৌপথেও যাওয়ার উপায় নাই। কারণ সিলেটে তখন মুষলধারে বৃষ্টি।

এতো বৃষ্টিযে নগরী সবচেয়ে উচু সড়কেও হাটু পানি। তার বাধ ভাঙ্গা স্রোত। তার মধ্যে সবগুলো নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে যাচ্ছিলো।

এমন পরিস্থিতিতে ক্যামেরা-ব্যাকপ্যাক লাইভি ডিভাইস রক্ষা করা কঠিন। জীবনেরও ঝুঁকি তো আছেই।

যাই হোক অফিসের সাথে আলোচনা করে আপাতত সিলেট শহরের বন্যা পরিস্থিতি তুলে ধরতে লাগলাম। সিলেট শহরের অবস্থাও ভয়ানক খারাপ।

বন্যার পানিতে ডুবে থাকা সিলেটবাসীকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে

বেশিরভাগ আবাসিক এলাকায় ঘরে কোমড় সমান পানি। তখনই ২দিন ধরে পানিবন্দি মানুষ। অনেক ঘর ছেড়ে আশেপাশে যাদের দোতলা বা বহুতল ভবনে আশ্রয় নিয়েছে।

অনেকে এলাকায় স্কুলে, কমিউনিটি সেন্টারে মানবেতর আশ্রয় নিয়েছে। মানুষের কষ্টের যেন শেষ নেই।

চ্যানেল আইয়ের দর্শকদের জন্য ঘন্টায় ঘন্টায় সেসব খবর তুলে ধরতে লাগলাম। আমাদের টার্গেট ছিল বেশি দুর্গত সুনামগঞ্জের দিকে যাওয়া।

কিন্তু ততক্ষণে সিলেটের সঙ্গে অন্যান্যা জেলা বা উপজেলাগুলো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তারওপর বিদ্যুৎ নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল নেট সার্ভারও ডাউন।

রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় ও তীব্র স্রোতের কারণ সড়ক পথে যোগাযোগ বন্ধ। মুষলধারে বৃষ্টি ও স্রোতের কারণ নৌপথে চলাচলও ঝুকিপুর্ণ।

আঞ্চলিক সড়কগুলোও পানিতে তলিয়ে গেছে

আঞ্চলিক সড়কগুলো ডুবে উপজেলাগুলোর সঙ্গেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে সিলেট। সেখানে মানুষের বাড়ি ঘরের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বন্যার পানি। হাওর বিলগুলোতে বাড়ির চাল দেখা যায় শুধু।

বন্যা রিপোর্ট কাভার করতে প্রায় এক সপ্তাহ ছিলাম সিলেটে। নিঃসন্দেহে আমার সাংবাদিকতা জীবনে এটি দারুণ অভিজ্ঞতা।

‘ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার আর সীমাপরিসীমা ছাড়া কষ্ট অত্যন্ত কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। যেখানেই গেছি সেখানেই ক্ষুধার্ত মানুষ আমাদের ঘিরে ধরেছে, ত্রাণের জন্য।’

“কেউ তিন দিন চারদিন না খাওয়া। অনেকের ঘরে ঢুকেও দেখেছি খাওয়ার মতো কিছুই নাই৷ তারা সাংবাদিক বুঝে না, মনে করতো আমরা বুঝি সরকারি লোক।”

যাদের বক্তব্য রেকর্ড করতাম বা যাদের নাম ঠিকানা নিতাম অন্যরা মনে করতো শুধু তারাই ত্রাণ সহায়তা পাবে। বাকিদের ঘর বাড়ি দেখানোর জন্য বা বক্তব্য নিতে পিড়াপীড়ি করতো।

লাইভি সরঞ্জাম নিয়ে অনবরত ছুটে চলছেন চ্যানেল আইয়ের রিপোর্টার আক্তার হোসেন

তারা আমাদের কাছে ত্রাণ চায়, সহযোগিতা চায়, কেউ কেউ গরুর খড় ঘাষও চেয়েছে। এরকম বহু গল্প আছে ঝুঁলিতে।

তবে পুরো সময়জুড়ে তাদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করতাম। মিথ্যা আশ্বাস দিতাম, অভয় দিতাম যে সহযোগিতা পাবেন।

এইসব ব্যাপারগুলো আমাকে ট্রমাটাইজ করে ফেলেছিল। তবে সেখানে থাকতেই ঢাকার অনেকের সঙ্গেই ফোনে যোগাযোগ হতো।

সারাদেশেই সিলেট বাসীর জন্য মাতম। অনেকেই ত্রাণ সহায়তার জন্য তথ্য চাইতো। তাদেরও প্রকৃত তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতাম।

সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে প্রচুর ত্রাণ সহায়তা গেছে সিলেট অঞ্চলে।

এছাড়া সিলেটের প্রবাসী ও গ্রামের উদ্যমী তরুণ সমাজ, রাজনৈতিক কর্মী সবাইকেই দেখেছি এক হয়ে যথাসম্ভব দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে।

গ্রামে গ্রামে নোঙ্গর খানা খোলা হয়েছে। সেখানে বড়হাড়িতে খিুচরি রান্না হতো-খিচুরি বিতরণ করে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছে স্থানীয় যুবকরা।

তবে এসবই ছিল খুবই অপ্রতুল। দেখা গেলো একটা মহল্লায় মানুষ ৩ হাজার। ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে ৫০-৬০জন।

আবার অনেকেই আত্মসম্মানের কারণে কারো কাছে হাত পাতেনি। ৩/৪দিন না খেয়ে কাটিয়েছে। এরকম বহুমানুষের ঘরে খোঁজ নিয়ে দেখেছি-খাবার মতো কিছুই নেই।

বানের জলে সব ভেসে গেছে। দোকানপাট তলিয়ে যাওয়ায় বাজারেও কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না।

এক রাতে প্রায় আধা ঘন্টা চেষ্টায় আমি ও আমার ক্যামেরা পার্সন ১ প্যাকেট বিস্কুট ও ৩ পিস কলা ম্যানেজ করতে পেরেছিলাম।

পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ। রিপোর্টিং এর কাজ শেষ করে বাসায় আসার পরেও সেই অসহায় মানুষগুলোর করুণ আর্তনাদ চোখের মধ্যে ভাসতো।

এরকম সময় আমার মামা গিয়াসউদ্দিন ফোন করে খোঁজ খবর নেওয়ার এক পর্যায়ে দুর্গতদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।

তখন আমি রিপোর্ট সংগ্রহের কাজে কোম্পানিগঞ্জের একটা গ্রামে কাজ করছিলাম। তাদের নানান অভিযোগের ফিরিস্তি।

ত্রাণ না পাওয়া, না খাওয়ার কথা জানাচ্ছিলেন। সরাসরি মামার সাথে তাদের কথা বলিয়ে তাদের কি কি চাহিদা সেটি জানলাম ও জানালাম।

সেই মতে তাদের কোম্পানির শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে চাল ডাল, তেল আলু, লবণ মরিচ সমেত এক সপ্তাহের খাবার মতো সামগ্রীর একটা বন্দোবস্ত হলো।

চ্যানেল আই এর মাধ্যমে বন্যার সংবাদ ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গোটা দেশে

তবে সেসব কেনাকাটা প্যাকেট করা কিংবা অর্থের যোগান করতে কিছুটা সময় লাগলো ততক্ষণে অফিসের নির্দেশে আমি সিলেট থেকে ঢাকা অফিসে যোগ দিতে হলো।

‘ঢাকায় চলে আসলেও মন পড়ে ছিল সিলেটের দুর্গত মানুষদের কাছেই’। ফোন দিলাম আমার বন্ধু সিলেট পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ইঞ্জিনিয়ার নাসির উদ্দিনকে।

যেহেতু তারা গ্রামে গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গ্রাহক সেবা দিয়ে থাকে। সেই হিসাবে সেখানকার গ্রাম পাড়া মহল্লা সম্পর্কে তাদের সম্মক ধারণা আছে।

আমি যেসব এলাকায় রিপোর্ট সংগ্রহের কাজে গিয়েছি যাদের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত যেসব পরিবারের গিয়েছি তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ খবর নিয়ে তালিকা করে।

সারাদিন পরিশ্রম করে সেসব জায়গায় খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেয়। আমাদের যে সিএনজি চালক আমাদের ঘুরিয়েছে আব্দুল আহাদকেও কাজে লাগালাম।

কারণ সিলেটে আমার দেখা ভালো মানুষদের একজন সে। তার মাধ্যমেও কয়েকটা মহল্লার তালিকা করে খাবার পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করলাম।

রাতের অন্ধকারে পানি মাড়িয়ে আব্দুল আহাদও দুর্গত মানুষদের সেইসব খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেয়। আল্লাহ তাদের সবার ত্যাগ ও শ্রম কবুল করুন। আমিন।

কলমে: আকতার হাবিব, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, স্টাফ রিপোর্টার, চ্যানেল আই

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন

পুরস্কার প্রাপ্তি অনুপ্রেরণা ও দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়

৩১ জুলাই রোববার দিনটি আমার জন্য আনন্দের। কারণ এদিন কাজের […]

বিদেশি ব্র্যান্ডের সিগারেট-গুল খায় আমাদের ফ্ল্যাটের জ্বিন !

রাজধানী ঢাকাতে দীর্ঘদিন সিঙ্গেল ফ্ল্যাটে ছিলাম। ২০২১ সালে ডিসেম্বরে কলিজার […]