অফবিট

ডাইনোসরের নতুন প্রজাতির সন্ধান!

এশিয়ার বিভিন্ন উপকূলে দুই পা, সামনের দিকের ছোট দুই হাত যেন অবিকল ধারালো ছুরি—এমনই ডাইনোসর ঘুরে বেড়াত ১৫৪ মিলিয়ন বছর পূর্বে।

জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের বরাত দিয়ে এমনি এক সংবাদ প্রকাশ করেছে মার্কিন বিজ্ঞান বিষয়ক ম্যাগাজিন লাইভ সায়েন্স।

ম্যাগাজিনটির সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়, ধারালো ছুরিবিশিষ্ট ডাইনোসরের জীবাশ্মের সন্ধ্যান পাওয়া গেছে পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানে।

এশিয়ার উপকূলে এমন ধারালো ডাইনোসরের জীবাশ্ম এবারই প্রথম পাওয়া গেছে বলে জাপানের গবেষকরা দাবি করেছেন। তাদের সঙ্গে ছিল মার্কিন গবেষকরা।

গবেষণায় জানানো হয়, জীবাশ্মটি একটি নতুন ডাইনোসরের প্রজাতি, যার নামকরণ করা হয়েছে প্যারালিথারাইজিনোসরাস জেপোনিসাস নামে।

বিভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসর

সমীক্ষা বলছে,ডাইনোসরটি থেরিজিনোসর নামে পরিচিত একটি শ্রেণি আওতাধীন। দুই পাবিশিষ্ট ও প্রাথমিকভাবে তিন আঙুলবিশিষ্ট তৃণভোজীর ডাইনোসর এটি।

এসব ডাইনোসরের নখ ধারালো ছুরির মতো। এই ধারালো নখ দিয়েই গাছপালা কাটা ও পশু শিকার করতো বিশালাকৃতির এই প্রাণিরা।

আক্রমণ বা আগ্রাসন হিসেবে নয়, এই ধারালো নখকে এই শ্রেণীর ডাইনোসররা খাদ্য অনুসন্ধানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত।

তাছাড়া ঝোপঝাড় ও গাছকে খাবারের জন্য তার মুখে তুলে নিত। ২০০৮ সালে জাপানের হোক্কাইডোতে এই জীবাশ্ম খোঁজ মিলেছে।

গবেষকদের আরেকটি দল খুঁজে পেয়েছিল সেটি। আবিষ্কারের সময় জীবাশ্মটি একটি কংক্রিটে মোড়ানো ছিল, শক্ত হয়ে যাওয়া খনিজের ন্যায় ছিল জীবাস্মটি।

শিল্পীর কল্পনায় বিশালাকৃতির ডাইনোসর

প্রথমে এটিকে টেরিজিনোসরাসের অন্তর্গত বলে মনে করা হলেও পরে তার প্রমাণ না মেলায় আবার গবেষণা শুরু হয়। বিজ্ঞানীরা আবার জীবাশ্মটি দেখার সিদ্ধান্ত নেন।

তাদের বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে, নতুন গবেষণার লেখকরা উপসংহারে পৌঁছেছেন যে জীবাশ্মটি একটি টেরিজিনোসরাসের অন্তর্গত ডাইনোসর, যাদের নখ ধারালো।

শুধু নমুনার ওপর ভিত্তি করে, টেরিজিনোসর কত বড় ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা অসম্ভব বলে জানিয়েছেন লাইভ সায়েন্সের গবেষক রয় এম হাফিংটন।

ডাইনোসরটি বড় ছিল, প্রায় ৩০ ফুট পর্যন্ত বাড়তে পারত ও তিন টন পর্যন্ত ওজন হতো বলেও জানান প্রাণী বিজ্ঞানী রয় এম হাফিংটন।

ডাইনোসরের সঙ্গে সবারই কমবেশি পরিচিতি আছে। শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি বিশালাকৃতির প্রাণীর অবয়ব। এ নিয়ে জানার আগ্রহের কারো কোন কমতি নেই।

জাপানে নতুন প্রজাতির ধারালো নখের ডাইনোসরের ফসিল 

এক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল ও শক্তিশালী এ প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণ করেছিল প্রায় ১৬০ মিলিয়ন বা ১৬ কোটি বছর ধরে।

পৃথিবীতে ডাইনোসরের উদ্ভব হয় ২৩০ মিলিয়ন বছর আগে, যা ট্রিয়াসিক যুগ নামে পরিচিক আর ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে,যা ক্রিটেশিয়াস-টারশীয়ারী যুগ নামে পরিচিত।

ডাইনোসর শব্দটি প্রবর্তন করেন ব্রিটিশ জীবাশ্ম বিজ্ঞানী রিচার্ড উইয়েন। গ্রিক শব্দ Denios ও Sauros থেকে এ শব্দের উৎপত্তি। Denios অর্থ ভয়ঙ্কর আর Sauros অর্থ টিকটিকি। পুরো অর্থ ভয়ঙ্কর টিকটিকি।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের বিজ্ঞানীরা ধারণা করতেন, ডাইনোসর ছিল ধীর গতিসম্পন্ন, স্বল্পবুদ্ধি ও ঠাণ্ডা মেজাজের প্রাণী, তবে পরবর্তীতে তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ হয়।

বিভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসর:

এদের কিছু প্রজাতি মাংশাসী, কিছু তৃণভোজী ছিল। আবার কিছু প্রজাতির ডাইনোসর দুই পায়ে হাঁটতে পারতো। আবার কিছু প্রজাতি চার পায়ে হাঁটতো।

কোনোটি উচ্চতায় ছিল প্রায় ১০০ ফুট আবার কোনোটির ছিল মুরগীর সমান। এ পর্যন্ত ডাইনোসরের আবিষ্কৃত প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৫ শতাধিক।

তবে জীবাশ্ম রেকর্ডের ভিত্তিতে ১৮৫০ টি প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যাবে বলে ধারণা করছেন জীবাস্ম গবেষকরা। তার মানে এখনো প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি আবিষ্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।

অবশ্য এর পূর্ববর্তী এক গবেষণায় পৃথিবীতে ৩৪০০ প্রজাতির ডাইনোসর ছিল বলে উল্লেখ করা হয়, যার অধিকাংশই অস্তিত্ব বর্তমানে টিকে থাকা জীবাশ্মে নেই।

ডাইনোসরের বিচরণ ছিল পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশে। এমনকি বরফে আচ্ছন্ন এন্টার্কটিকা মহাদেশেও এর অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রজাতিভেদে ডাইনোসরের আকার ও আকৃতিগত অনেক বিভিন্নতা ছিল। বৃহদাকার ডাইনোসরদের মধ্যে যেগুলোর নাম উল্লেখযোগ্য তাদের মধ্যে একটি হলো জিরাফাটিটান ব্রানসাই ( Giraffatitan brancai)।

বিভিন্ন আকৃতির ডাইনোসরের ফসিল

যার উচ্চতা ছিল ১২ মিটার বা ৩৯ ফুট ও লম্বায় ২২.৫ মিটার বা ৭৪ ফুট ও ওজন ছিল ৩০ হাজার থেকে ৬০ হাজার কেজি।

তানজানিয়ায় এর অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয়। এছাড়াও আছে টি-রেক্স (T-Rex) নামের প্রজাতির ডাইনোসরের দৈর্ঘ্য ছিল ৪০ ফুট ও উচ্চতা ১৫ থেকে ২০ ফুট।

ডিপলোডোকাশ ( Diplodocus) নামের আরেক প্রজাতির ডাইনোসর ছিল, যা লম্বায় ২৭ মিটার বা ৮৯ ফুট ছিল। এর অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয় আমেরিকায়।

বিশালাকার তৃণভোজীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আর্জেন্টাইনোসাওরাস জার( Argentinosaurus zar) এটির ওজন ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ কেজি।

এছাড়াও রয়েছে ডিপলোডোকাশ হ্যালারাম (Diplodocus hallorum) নামের আরেক প্রজাতির ডাইনোসর, যা লম্বায় ৩৩.৫ মিটার বা ১১০ ফুট ও ৩৩ মিটার দীর্ঘ।

ডাইনোসর বলতে যে শুধু বিশালাকার দেহের প্রাণি বোঝায় তা নয়। বরং খুবই ছোট আকারের ডাইনোসরও সেসময় ছিল। সবচেয়ে ছোট ডাইনোসর এঞ্চিউরনিস( Anchiornis)।

লম্বা মাথা বিশিষ্ট তৃণভোজী ডাইনোসর 

এঞ্চিউরনিসের ওজন ছিল ১১০ গ্রাম। তৃণভোজী মাইক্রোসেরিটাস( Microceratus) ও ওয়ানানোসাওরাস ( Wannanosaurus) ডাইনোসরও ছিল, যাদের দৈর্ঘ্য ৬০ সেন্টিমিটার বা ২ ফুট ছিল।

ডাইনোসরের বসবাস:

অন্যান্য প্রাণীর মতো ডাইনোসরও দলবদ্ধভাবে বসবাস করতো। তাদের মধ্যে মাতৃসুলভ আচরণও ছিল প্রকট। কোন কোন প্রজাতির শৈশবকাল তুলনামূলকভাবে অন্য প্রজাতির চেয়ে বেশি ছিল।

ডাইনোসরের বিলুপ্তির কারণ:

ডাইনোসরের বিলুপ্তির সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরিভাবে জানা যায়নি। কিন্তু অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন, কোনো বড় আকারের উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর উপর প্রবলভাবে আঘাত হানার ফলে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, উল্কাটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৫ কিলোমিটার। সেটা এসে পড়েছিল মেক্সিকো উপসাগর তীরবর্তী ইউকাটান উপদ্বীপ এলাকায়।

যার আঘাত পারমাণবিক বোমার চেয়ে এক বিলিয়ন গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। এই উল্কা পিণ্ডের কারণে ডাইনোসরের বিলুপ্তি ঘটে।

ডিমের খোসা থেকে বের হচ্ছে ডাইনোসর

আবার কোন কোন বিজ্ঞানীর ধারণা, উল্কার আঘাতে নয় বরং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুাৎপাতের কারণেই ডাইনোসর বিলুপ্তিরপ পথে অগ্রসর হয়।

তাছাড়া অনেক বিজ্ঞানী ডাইনোসর বিলুপ্তির জন্য খাদ্যাভাবকেও একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সেসময় মাংশাসী ডাইনোসর তৃণভোজী ডাইনোসরদের খেয়ে ফেলত বিধায় এক সময় খাদ্যাভাব দেখা দেয় পৃথিবীতে, যা বিলুপ্তির অন্যতম কারণ।

এর বাইরে তাপমাত্রার পরিবর্তনকেও উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করছেন কোন কোন বিজ্ঞানী ও জীবাস্ম গবেষক।

অনেক গবেষক মনে করেন, সেসময় পৃথিবীব্যাপী তাপমাত্রার এক ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, যার সাথে অভিযোজিত হতে না পেরে অনেক প্রজাতির বিলুপ্ত হয়, যার মধ্যে ডাইনোসরও ছিল।

সিনেমার পর্দায় বিশালাকৃতির ডাইনোসর

বিশালাকার ডাইনোসরেরা চলাফেরায় ধীর ও স্থবিরতা, নোংরা পরিবেশের কারণে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া ঘটিত রোগের শিকার হয়। আর এভাবে এক সময় বিলুপ্তি দিকে যেতে থাকে।

ডাইনোসরের বিলুপ্তির জন্য আরেকটি কারণ তাদের ডিমের খোসার পুরুত্ব বলে মনে করছেন কিছু কিছু জীবাস্ম গবেষক ও বিজ্ঞানী।

গবেষণায় পরীক্ষায় দেখা যায়, সাড়ে ৬ কোটি বছর আগের ডিমের খোসা ১২ থেকে ১৪ কোটি বছর আগের ডিমের খোসার চেয়ে যথেষ্ট পুরুত্ব ছিল।

এই কারণে ডিমের খোসা ভেঙ্গে বেরিয়ে আসা বাচ্চা ডাইনোসরের পক্ষে অনেকটাই অসম্ভব ও কষ্টসাধ্য ছিল। এর ফলে পরবর্তীতে বিকলাঙ্গতা দেখা দিতো ও প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেত।

এভাবে এক সময় তারা বিলুপ্তি হতে থাকে। তবে ছবিতে বা সিনেমার পর্দায় আমরা যে ধরনের ডাইনোসর দেখি তা কেবল পরিচালক ও চিত্র শিল্পীদের ধারণা কেবল।

তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স ও বিবিসি

কলমে: মোহাম্মদ রবিউল্লাহ, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও অনুবাদক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন