ফার্স্ট লেডি

জনপ্রিয় শিক্ষিকা আমেরিকার ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন

২০২১ সালে আমেরিকার আলোচিত নাম জো বাইডেন ও ক্যাথরিন জিল। আমেরিকা ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরে প্রায় গোটা বিশ্বের মিডিয়ায় তার নাম চর্চা হতে থাকে। সবাই জিল বাইডেন হিসেবেই চেনে তাকে। পেশায় তিনি একজন শিক্ষিকা।

হোয়াইট হাউস তার আবাসস্থল হলেও তিনি একজন শিক্ষক। আমেরিকার ইতিহাসে পূর্ণকালীন পেশাজীবী নারী হিসেবে প্রথম ফার্স্টলেডি ড. জিল বাইডেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার সময় জিল তার স্বামী জো বাইডেনের সঙ্গে যোগ দেন। আমেরিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট বাইডেন সেসময় ‘সম্ভাব্য ফার্স্ট লেডি’ হিসেবে কয়েক দশকের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা সম্পন্ন স্ত্রী জিলের নানান গুণের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। এরপর তার নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৭৭ সালে নিউ ইয়র্কে বিয়ে করে সংসার শুরু করেছিলেন জো আর জিল

১৯৭৭ সালে নিউ ইয়র্কে বিয়ে করে সংসার শুরু করেছিলেন জো আর জিল। ৪ বছর পর তাদের মেয়ে অ্যাশলে বাইডেনের জন্ম। জোর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার আগে ১৯৭০ সালে জিলের বিয়ে হয়েছিল সাবেক কলেজ ফুটবলার বিল স্টিভেনসনের সঙ্গে।

তবে ১৯৭৪ সালে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ১৯৭২ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় জো বাইডেন তার প্রথম স্ত্রী ও এক বছর বয়সী মেয়েকে হারান। তবে ওই দুর্ঘটনায় তাদের দুই ছেলে বেঁচে গিয়েছিল।

ওই ঘটনার তিন বছর পর জিলের সঙ্গে জো-র পরিচয় হয়। জো-র ভাইয়ের মাধ্যমে এ পরিচয় হয়েছিল বলে জিল জানান।

নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর হাস্যজ্জ্বল জো ও জিল

ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ক্যাথরিন জিল বলেন, ‘অনেক মার্কিন নারীই নিজেদের কর্মজীবন ও পরিবার একসঙ্গে সামলান। কিন্তু ফার্স্ট লেডিরা এটি করতে পারেন না। কিন্তু এখন সেই সময় এসেছে যে আমেরিকানরা অভ্যন্ত হবেন যে ফার্স্ট লেডি ২৪ ঘণ্টা হোয়াইট হাউসে থাকবেন না।’

২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বামীর সূত্রে জিল আমেরিকার ‘সেকেন্ড লেডি’ ছিলেন। আর ফার্স্ট লেডি ছিলেন বারাক ওবামার স্ত্রী  মিশেল ওবামা।

ওই ৮ বছর তিনি কমিউনিটি কলেজের প্রসার, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের পরিবারের সহায়তায় নানান কর্মকাণ্ড এবং স্তন ক্যান্সার রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে যুক্ত ছিলেন।

জিল বাইডেনের দুইটি মাস্টার্স ডিগ্রি রয়েছে

তবে মজার ব্যাপার হলো হোয়াইট হাইজের বাসিন্দা হলেও তিনি তার শিক্ষকতা ছাড়েননি। তিনি আমেরিকার শিক্ষার দ্রুতি ছড়াচ্ছেন। শিশু ও বড়দের কাছে খুবই জনপ্রিয় শিক্ষিকা।

তিনি ডেলাওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেছেন, পাশাপাশি ওয়েস্ট চেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভিলেনোভা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

তিনি ১৩ বছর ধরে উচ্চ বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষিকা ছিলেন এবং মনোচিকিৎসা হাসপাতালে সংবেদনশীল প্রতিবন্ধী কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষিকা ছিলেন।

একজন কঠোর শিক্ষক হিসাবেই জানেন জিলের ছাত্র-ছাত্রীরা

আমেরিকার নির্বাচনে আরও অনেক কিছুর মতো নতুন ইতিহাস তৈরি করেছেন। তিনি হোয়াইট হাউজে আসা প্রথম ফার্স্ট লেডি যিনি একজন চাকরিজীবী।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি জানিয়েছিলেন, নর্দার্ন ভার্জিনিয়ার একটি কমিউনিটি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক হিসাবে তিনি তার শিক্ষকতা পেশা ধরে রাখবেন। সেখানে তাকে একজন কঠোর শিক্ষক হিসাবেই জানেন তার ছাত্র-ছাত্রীরা।

সিবিএস টেলিভিশনকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে সম্প্রতি তিনি বলেন, ”এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, আমি চাই মানুষ শিক্ষকদের মূল্যায়ন করুক। তাদের অবদান সম্পর্কে জানুন, তাদের মর্যাদা দিক।”

তৎকালিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ও সেকেন্ড লেডি জিল

ডক্টরেট ডিগ্রি থাকায় তিনি হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৩১ বছরের ইতিহাসে প্রেসিডেন্টের প্রথম সর্বোচ্চ শিক্ষিত অর্ধাঙ্গিনী। পুরো জীবন ধরে শিক্ষকতা করে আসা জিল বাইডেনের দুইটি মাস্টার্স ডিগ্রির একটি ইংরেজি ও পড়াশোনার ওপরে।

অধ্যাপক জিল বাইডেনের আরেকটি পরিচয় রয়েছে। তিনি তার স্বামীর একজন রক্ষকে দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী সমাবেশে বাধা সৃষ্টিকারীদের ঠেকানো ও বাইরে বের করে দেয়ার কাজে স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তা করেন। তবে এখন এসব দায়িত্ব সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যরাই পালন করেন।

হোয়াইট হাউজে অধ্যাপক জিল বাইডেন বারাক ওবামার পুরো মেয়াদজুড়ে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ড লেডি। সেই সময়েও তিনি তাঁর শিক্ষকতা পেশা অব্যাহত রেখেছিলেন।

স্মৃতিচারণায় জো বাইডেন ও জিল বাইডেন

সেকেন্ড লেডি হওয়ার পর সর্বশেষ যিনি ফার্স্ট লেডি হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের স্ত্রী বারবারা বুশ। ১৯৮৯-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি ফার্স্ট লেডি ছিলেন।

সেকেন্ড লেডি হিসাবে দ্বিতীয় দফার দায়িত্ব পালনের সময় নারীদের বিভিন্ন সমস্যা, স্তন ক্যান্সার থেকে সুরক্ষা, শিক্ষা ও নিটি কলেজের গুরুত্ব তুলে ধরা আর সামরিক বাহিনীর পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কাজ করেছেন।

কলেজ জীবনের প্রেমিকা, প্রথম স্ত্রী নেইলিয়া এবং তাদের মেয়েকে ১৯৭২ সালে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় হারান জো বাইডেন। তিন বছর পরে তার সঙ্গে পরিচয় হয় জিল জ্যাকবসের।

বয়সে প্রবীণ হলেও কমেনি জো জিলের রোমান্স

সেই সময় জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর, আর জিল ছিলেন কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। দুইজনেরই আগে একবার বিয়ে হয়েছিল।

স্মৃতিচারণায় ২০০৭ সালে জো বাইডেন লিখেছিলেন, ”সে আবার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে। আবার নতুন করে পরিবার শুরু করার ব্যাপারে তিনি আমাকে ভাবতে বাধ্য করেছিলেন।”

জিল বাইডেন ভোগ ম্যাগাজিনকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ”তাদের প্রথম ডেটিংয়ের সময় (একটি সিনেমা দেখতে যাওয়া) জো বাইডেন একটি স্পোর্ট কোট আর লোফার জুতা পড়ে এসেছিলেন।”

প্রাণবন্ত জো বাইডেন ও জিল বাইডেন

”আমি ভেবেছিলাম, হায় ঈশ্বর, এখানে কোন কিছু হবে না, কোন দিন এখানে সম্পর্ক হবে না। তিনি ছিলেন আমার চেয়ে নয় বছরের বড়ো।”

কিন্তু এরপরে এই যুগলের সম্পর্কটা যেন তৈরি হয়ে যায়। সেই রাতের শেষে বিদায়ের সময় জিলের সঙ্গে করমর্দন করে বিদায় নেন জো বাইডেন।

মধ্যরাতে মাকে ফোন করে জিল বলেন, ”মা, আমি অবশেষে একজন ভদ্রলোককে খুঁজে পেয়েছি।”

হোয়াইট হাউজে দুজনের আবার প্রত্যাবর্তন

তবে এরপরেও বিয়েতে জিলের সম্মতি পেতে জো বাইডেনকে অন্তত পাঁচ দফা চেষ্টা করতে হয়েছে।

জিল বাইডেন বলছেন, তিনি প্রতিবারই বলেছেন, ‘এখনি নয়’ কারণ তিনি শতভাগ নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যেন বিয়েটা বাইডেনের দুই ছেলে, হান্টার আর বেয়াউর জন্য সঠিক হয়।

বাইডেন রসিকতা করে বলেন, সম্মতি দেয়ার জন্য ভবিষ্যৎ স্ত্রীকে তিনি হুমকি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: ইউএস টুডে, বিবিসি, সিবিএস ও ভোগ ম্যাগাজিন

লেখক: আওলাদ হোসাইন, ভিডিও সম্পাদক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

 

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন

এবার ভারতের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বিমানে বাংলাদেশের ‘গন্ডি’

কৌশিক প্রিয়ালী: ভালো গল্প আর মনোমুগ্ধকর অভিনয়ের নৈপুন্যে যে কোন […]