সাহিত্য

কাজী নজরুলের যত বসতবাড়ি!

হিমালয় আহমেদ: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘ দিন কলকাতায় কাটিয়েছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয়, তিনি বেশিদিন কোথাও কাটাননি। বারেবারেই বাসা বদল করেছিলেন।

কবি নজরুলের দীর্ঘদিনের সাথী কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজফ্‌ফর আহমদ এবং অন্যান্যদের লেখা থেকে সংগ্রহ করে সেই বিষয়ে কিছু আলোকপাত করছি।

১৯১৭ সালে নজরুল সৈন্যদলে নাম লেখানোর জন্য প্রথম কলকাতায় এসে উঠেছিলেন ৭১ কৈলাস বোস স্ট্রিটের বাড়িতে। সৈন্যদলে যুক্ত হয়ে তিনি চলে যান ফোর্ট উইলিয়ামের আবাসে। সেখান থেকে তিনি চলে যান বর্তমান পাকিস্তানের করাচিতে।

সৈন্যদলের কাজ শেষ হলে ১৯২০ সালের মার্চে করাচি থেকে চলে আসেন ২০ রামকান্ত বোস স্ট্রিতে। সেখানে জাতিগত কারণে সমস্যা হওয়ায় সেই মার্চের শেষের দিকেই তিনি ৩২ কলেজ স্ট্রিটে মুজফ্‌ফর আহমদের ঘরে বসবাস শুরু করেন।

১৯২০ থেকে ১৯২১ সালে নজরুল ইসলাম ও মুজফ্‌ফর আহমদ টার্নার স্ট্রিটে কিছুদিন কাটিয়েছেন। এই সময় নজরুল দেওঘর চলে গিয়েছিলেন। মুজফ্‌ফর আহমদ তাকে ফিরিয়ে আনেন।

একই সময়ে নজরুলের ব্রিটিশ-বিরোধী কবিতা ছাপার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেফতার করতে গেলে মুজফ্‌ফর আহমদ তাকে কুমিল্লায় পাঠিয়ে দেন এবং কুমিল্লাতেই তাকে ১৯২২ সালে গ্রেফতার করা হয়। ফলে তাকে বেশ কিছুদিন প্রেসিডেন্সি, আলিপুর ও হুগলি জেলে থাকতে হয়েছিল।

এই সময় খুব সামান্য সময়ের জন্য নজরুল ৯৩/১এ বৌবাজার স্ট্রিট ও ৭ প্রতাপ চ্যাটার্জি লেনের বাড়িতে বসবাস করেছিলেন। ১৯২৪ সালে ৬ হাজী লেনে বিবাহ হয়েছিল নজরুল ও প্রমীলা দেবীর।

এরপরে ১৯২৬-২৭ সালে নজরুল কৃষ্ণনগরে থাকেন এবং ফিরে এসে ওঠেন ১৫ জেলিয়াটোলা স্ট্রিটে।১৯২৮ সালে ওঠেন ১১ ওয়েলসলি স্ট্রিটে।

সেখান থেকে সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে সে বছরেই গিয়ে ওঠেন ৮ পানবাগান লেনের বাড়িতে। তারপর ১৯৩০ সালে আবারো কবিতা লেখার অপরাধে নজরুল গ্রেফতার হন ৩৯/২ মসজিদ বাড়ি স্ট্রিটের বাড়ি থেকে।

১৯৩১ সালে ৩৯ সীতানাথ রোডের বাড়িতে তিনি বসবাস শুরু করেন। এই সময় কবির আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো ছিল। ১৯৩৯ সাল থেকে নজরুলের আস্তানা হয় ৫৩ জি হরি ঘোষ লেন।

আবার ১৯৮২ সাল থেকে তিনি বসবাস করতে থাকেন ১৫/৪ শ্যাম স্ট্রিটের বাড়িতে। এরপর অসুস্থ নজরুল মধুপুর চলে যান এবং এবং ফিরে এসে ২ নাটোর পার্কে দীর্ঘ কয়েকমাস চিকিৎসারত ছিলেন।

পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে কবির বাসস্থান হয়ে ওঠে ১৬ রাজেন্দ্রলাল স্ট্রিট। আবার এই দশকের শেষের দিক থেকে ষাটের দশকের প্রথম কয়েক বছর কবি বসবাস করেন ১৫৬ মন্মথ দত্ত রোডের বাড়িতে। এই বাড়িতেই কবি পত্নী প্রয়াত হন।

১৯৬৩ সালে সম্বিৎহারা কবিকে রাখা হয় ক্রিস্টোফার রোডের বাড়িতে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে যাবার আগে পর্যন্ত কবি নজরুল ইসলাম এই বাড়িতেই ছিলেন।

যেসব বাড়িতে কবি বিভিন্ন সময়ে বসবাস করেছিলেন সেগুলি বেশিরভাগই তাঁর কোনো বন্ধুবান্ধব বা শুভানুধ্যায়ীর বাড়ি। কিছু ছিল মুজফ্‌ফর আহমদের ভাড়া করা বাড়ি।

একমাত্র শেষের দিকেই তিনি তাঁর পুত্রদের নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করেছিলেন। বলাবাহুল্য সে সময় কবির কোনো সম্বিৎ ছিল না।

এছাড়াও সাময়িকভাবে কলকাতার কিছু অফিস ও বাড়িতে বিভিন্ন সময়ে কবি রাত্রি যাপন করেছিলেন।

সেগুলি হলো ৮ জ্যাকেরিয়া স্ট্রিট, ৩৮ কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, ৬/৪ দ্বারকানাথ ঠাকুর লেন, ৭৯ বলরাম দে স্ট্রিট, ১০/১ আরপুলি লেন, ১০/২ পটুয়াটোলা লেন, নয়ন চাঁদ দত্ত স্ট্রিট, ৫৫ মানিকতলা স্ট্রিট, ৩৭ হ্যারিসন রোড, ২/১ ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেন, ১৬ বিবেকানন্দ রোড, ৯২/১ গ্রে স্ট্রিট, ১২৩ লোয়ার সারকুলার রোড ইত্যাদি।

সম্প্রতি কবি নজরুল ইসলামের স্মরণে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার ইন্দিরা ভবনের নাম পরিবর্তন করে নজরুল ভবন করার উদ্যোগ নিয়েছিল। কংগ্রেস দলের আপত্তির কারণে সেটা হয়নি।

প্রকৃতপক্ষে ইন্দিরা ভবনের সাথে নজরুল ইসলামের কোনো সম্পর্ক কোনো কালেই ছিল না। কারণ কবি কোনোদিনই ইন্দিরা ভবনে ছিলেন না।

শোনা যাচ্ছে অন্যত্র কোনো স্থানে নজরুল ভবন করা হবে। নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত এত স্থান কলকাতায় থাকতে অন্যত্র এই উদ্যোগের কোনো প্রয়োজন নেই।

নজরুল ইসলামের জন্য কলকাতায় অবশ্যই একটি স্মরণীয় ভবন প্রতিষ্ঠা করা উচিৎ। আর সেটির জন্য বেছে নেওয়া যেতে পারে তাঁর স্মৃতিবিজড়িত যে কোনো একটি স্থান।

নজরুলের স্মৃতি বিজরিত স্থানগুলির সংখ্যা কলকাতা শহরে প্রচুর। সেগুলি মধ্যে অনেকগুলি জরাজীর্ণ হলেও বেশকিছু ভবন এখনো আগের চেহারায় আছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার পদক্ষেপ নিলে সেগুলির কোনো একটা বাড়ি অধিগ্রহণ করে নজরুল ভবন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

আশা করা যায়, কবির বংশধররা এ বিষয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন। কলকাতা শহরে নজরুল প্রেমী মানুষের সংখ্যা বিপুল। আর যদি তা করা যায় তাহলে সেটা হবে কবির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন।

লেখক: সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও অনুবাদক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন