বিলুপ্ত হওয়ার প্রায় ছয় দশক পর মরুর বুকে আবার বিচরণ করছে হরিণের মতো দেখতে সাদা অরিক্স। সরু শিংযুক্ত এই বিপন্ন প্রাণির শরীরের উজ্জ্বল সাদা আবরণের কারণে আরবে এটি “সাদা অরিক্স” নামে পরিচিত। পৌরাণিক কাহিনীতে অরিক্স সৌভাগ্য ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
মরুর উষ্ণ পরিবেশের সাথে এরা দারুণভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। সাদা পশম মরুভূমির তাপের বিপরীতে নিজেদের ঠান্ডা করার জন্য সূর্যালোক প্রতিফলিত করতে সক্ষম, গ্রীষ্মকালে ১৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পর্যন্ত সহ্য করতে পারে মরুভূমির এই প্রাণিরা।

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন-আইইউসিএন’র তথ্য বলছে, এক সময় আফ্রিকা মহাদেশের মিশর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের ইয়েমেনে এই প্রজাতির অরিক্সদের অবাধ বিচরণ ছিল, কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে অতিরিক্ত শিকারের কারণে বনাঞ্চলে এটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
এরপর অরিক্স সংরক্ষণ প্রচেষ্টা শুরু করে প্রাণি প্রেমী ও পরিবেশ সংরক্ষণবিদরা। এরই অংশ হিসেবে সাদা অরিক্সদের বন্দী করা হয়। বন্দী দশায় প্রজনন ও বনাঞ্চলে পুনঃরায় ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের বনাঞ্চলে ১ হাজার ২২০টি অরিক্স উন্মুক্তভাবে বিচরণ করছে। আর বন্দী দশায় আছে ৬০০০-৭০০০ অরিক্স।

২০২১ সালে ওমানের হাইমাতে আল ওয়াস্তা প্রাণি ও পরিবেশ সংরক্ষণ কেন্দ্রে দুইটি আরবীয় অরিক্সের শিং দেখা যায়। এরাবিয়ান অরিক্সের শিংকে প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিংশ শতাব্দীতে শিকারিরা অরিক্সের শিংয়ে অলৌকিক বা জাদুকরী ক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করতেন। ওমানের বাইরেও অনেক দেশে অরিক্সের শিং সযত্নে রাখতে দেখা যায়।

অবৈধ শিকার, তৃণভূমির অভাব ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এখনো হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে সৌভাগ্যের প্রতীক অরিক্স। তবে আশার বাণী হচ্ছে বন্দী দশায় রেখে প্রজনন করানোর ফলে বিপন্ন প্রাণির তালিকায় উন্নতি হয়েছে।
বন্দী দশায় এদের চিত্তাকর্ষক প্রত্যাবর্তনের ফলে ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন-আইইউসিএ’র তালিকায় বিপন্ন প্রাণি থেকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রাণির তালিকায় স্থান পায় সাদা অরিক্স। বর্তমানে কেবল ইসরায়েল, জর্দান, ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ক্ষুদ্র পরিসরে এদের বিচরণ দেখা যাচ্ছে।

১৯৬২ সালে যখন ৫০০ টিরও কম আরবীয় অরিক্স বনে অবশিষ্ট ছিল, তখন সংরক্ষণবাদীরা এসব প্রাণিদের বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে “অপারেশন অরিক্স” নামে বর্তমানে দক্ষিণ ইয়েমেনের মরুভূমিতে একটি প্রকল্প চালু করে। সেখান থেকে তিনটি অরিক্স যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্স চিড়িয়াখানায় পাঠানো হয়। সেখানেই প্রথমবারের মতো বন্দী দশায় প্রজনন কর্মসূচি শুরু করা হয়।

দুই দশক পর একাধিক দেশের সরকার, চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ও সংরক্ষণবাদীদের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রকল্পটি সফলতার মুখ দেখে। বদ্ধ ঘরেই বন্য প্রাণিদের প্রজননের মতো ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। ২০০৭ সালে বিভিন্ন দেশ একত্রিত হয়ে অরিক্সগুলোকে সংরক্ষণ অব্যাহত রাখার জন্য একটি কৌশল তৈরি করে।
এই কৌশলের মধ্যে একটি ছিল স্টাডবুক। স্টাডবুক হচ্ছে বন্দী প্রাণিদের প্রজনন নিয়ন্ত্রণের জন্য সংখ্যার রেকর্ড রাখার উপকরণ। এটি ঘোড়া, কুকুরসহ ঘরে পোষা প্রাণির প্রজননের হিসেব রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়।

সাধারণত আরবীয় অরিক্সরা তৃণভোজী। এরা মরুভূমির ঘাস ও গুল্ম খেয়ে জীবনযাপন করে। পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে এরা ৫৬ মাইল (৯০ কিমি) দূর থেকে বৃষ্টিপাত ও উদ্ভিদের বৃদ্ধি সনাক্ত করতে পারে। প্রায়শই চারণভূমির সন্ধানে দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়ায়।
তবে অরিক্সদের দূরে বেড়ানোকে হুমকি হিসেবে দেখে আইইউসিএন। সংস্থাটির সতকর্তা দিয়ে বলেছে, দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়ানো অরিক্সদের ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে, কারণ সুরক্ষিত এলাকার বাইরে গেলে এরা শিকার বা যে কোনো দুর্ঘটনায় পড়তে পারে।
অরিক্সের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার এই প্রচেষ্টায় যুক্ত হতে ইরাক, কুয়েত ও সিরিয়াকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সংরক্ষণবাদীরা ভবিষ্যতে এই দেশগুলোতে বন্দী অরিক্সদের ওপর নজর রাখবে বলে জানিয়েছে।
অনুবাদ: মোহাম্মদ রবিউল্লাহ, সূত্র: সিএনএন