অফবিট

আবারো বিশ্বখ্যাত শিল্পকর্ম মোনালিসার ছবিতে হামলা

বিশ্বের বৃহত্তম শিল্পকলা জাদুঘর হিসেবে পরিচিত ল্যুভর। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের সেন নদীর তীরে অবস্থিত জাদুঘরটি প্রায় আট লাখ বর্গফুটের।

এতে রয়েছে অনেক বিখ্যাত শিল্পকর্ম। এর মধ্যে আছে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সাড়া জাগানো পোট্রেট ‘মোনালিসা’। ভিঞ্চি এই চিত্রকর্মে কাকে এঁকেছেন, তা নিয়ে কম পানি ঘোলা হয়নি।

বৃদ্ধা সেজে হামলা:

সম্প্রতি মোনালিসার ছবি নিয়ে ঘটেছে বিচিত্র ঘটনা। মাথায় পরচুলা (আলগা চুল) পরে বৃদ্ধা সেজে এক যুবক মোনালিসার ছবিতে সাদা ক্রিম কেক ছুড়ে মেরেছেন।

এর আগে বৃদ্ধা সেজে হুইল চেয়ারে করে জাদুঘরে ঢুকে পড়েন ওই দুষ্ট তরুণ। মোনালিসার ছবির সামনে গিয়েই সাদা ক্রিম কেক ছুড়ে মারেন ওই যুবক।

এ ঘটনার পর যদিও ভিঞ্চির অমর সৃষ্টি অক্ষত আছে। যেহেতু ছবিটি একটি সুরক্ষা কাঁচের ভেতরে রাখা। ফলে কেকের ক্রিম গিয়ে ছবির সামনের কাঁচে লেগেছে। তবে বৃদ্ধা সাজা ওই যুবকের মানসিক সমস্যা আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তারক্ষীরা যখন ওই যুবককে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি চিৎকার করে বলছিলেন: ‘পৃথিবীর কথা ভাবো। কিছু মানুষ পৃথিবী ধ্বংস করতে চাইছে। ’

প্রত্যক্ষদর্শীরা যা জানালেন:

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ওই দর্শনার্থী পরচুলা পরে এক বৃদ্ধার ছদ্মবেশে ল্যুভরে ঢুকেছিলেন। সে সময় একটি হুইলচেয়ারে বসা ছিলেন। আদতে তিনি একজন পুরুষ ছিলেন এবং কোনোভাবেই প্রতিবন্ধী ছিলেন না।

একপর্যায়ে হুইলচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মোনালিসার চিত্রকর্মের দিকে এগিয়ে যান ওই দর্শনার্থী। চেষ্টা করেন চিত্রকর্মটির বুলেটপ্রুফ কাচ ভেঙে ফেলার। এতে বিফল হলে ছুড়ে দেন কেক। এর আগে চিত্রকর্মের দিকে গোলাপও ছুড়ে দিয়েছিলেন তিনি।

এই হুইল চেয়ারে বসেই মোনালিসার ছবিতে হামলা করা হয়

ল্যুভর মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, পরচুলা পরা এক ব্যক্তি হুইলচেয়ারে চড়ে ‘মোনালিসা’র দিকে যাচ্ছেন। পরে তাকে হুইলচেয়ার পাশে রেখে দাঁড়াতে দেখা যায়।

মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের বার্তায় বলা হয়, চলাফেরা করতে সমস্যা আছে এমন ব্যক্তিদের বিশেষ বিবেচনায় সাধারণ দর্শকদের সামনে যাওয়া অনুমতি দেওয়া হয়। যাতে তারা কাছে থেকে শিল্পকর্মগুলো ভালোভাবে দেখতে পান।

এতে আরও বলা হয়, ‘মোনালিসা’র কাছে গিয়ে সেই ব্যক্তি দাঁড়িয়ে যান এবং তার কাছে লুকিয়ে রাখা কেক ছুড়ে মারেন। সেটি ‘মোনালিসা’র সামনের কাঁচে গিয়ে পড়ে। তবে এতে শিল্পকর্মটির কোনো ক্ষতি হয়নি।’

সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল:

এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে দেখা যায়, চিত্রকর্মটির বুলেটপ্রুফ কাচের ওপর কেক মেখে আছে। আর বাকি দর্শনার্থীদের উদ্দেশে ছদ্মবেশে থাকা ওই ব্যক্তি ফরাসি ভাষায় কিছু একটা বলছেন।

মুহুর্তেই ভাইরাল হয় কেক হামলার দৃশ্য

আল জাজিরার খবরে বলা হয়, লোকটির পরিচয় জানা না গেলেও ওই দর্শনার্থী একজন পরিবেশ অধিকারকর্মী ছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে।

সুরক্ষা কাঁচে রক্ষা: 

গত শতকের পাঁচের দশক থেকে মোনালিসাকে সুরক্ষা কেসে রাখা হয়। এর আগে ছবিটির দিকে অ্যাসিড ছুড়ে মারা হয়েছিল। ২০০৯ সালে এক নারী ছবিটি লক্ষ্য করে কাঁচের কাপও ছুড়ে মারেন। তবে সুরক্ষা কাঁচে লেগে কাপটি ভেঙে যায়।

ল্যুভরে মোনালিসার ছবি স্থায়ীভাবে রাখা আছে। ষোড়শ শতকে ফ্রান্সের রাজা প্রথম ফ্রান্সিস এই ছবিকে দেশের সম্পত্তি বলে ঘোষণা করেছিলেন।

আজোও রহস্য হয়ে আছে:

ভিঞ্চি মোনালিসার ছবি নিয়ে কাজ করেছিলেন ১৫০৩ সাল থেকে ১৫১৭ সাল পর্যন্ত। শুরু করেছিলেন ইতালির ফ্লোরেন্সে, তারপর ফ্রান্সে। তবে তিনি আসলে কার পোট্রেট তৈরি করেছিলেন সেই প্রশ্ন মোনালিসার হাসির মতোই আজোও রহস্য হয়ে আছে।

তবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা হলো- পোট্রেটের এই নারী ফ্লোরেন্সের তৎকালীন একজন সিল্ক ব্যবসায়ীর স্ত্রী, যার নাম লিসা গেরারদিনি। তবে এই তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছেন প্যারিসের একজন বিজ্ঞানী পাসকাল কোট।

পোট্রেটের নারী লিসা গেরারদিনি নন:

২০০৪ সালে ল্যুভর কর্তৃপক্ষ তাকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে এই পোট্রেটের ছবি তোলার সুযোগ করে দেয়। দীর্ঘদিন বিশেষ আলো ও লেন্সের প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষণার পর এই বিজ্ঞানী বলেছেন, পোট্রেটের নারী লিসা গেরারদিনি নন,অন্য কেউ। তবে অন্য  কেউ কে তাও বলতে পারেনি।

কেক হামলার পরে মোনালিসার ছবি

প্যারিসের প্রসিকিউটর কার্যালয় গণমাধ্যমকে জানায়, ৩৬ বছর বয়সী সেই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে পুলিশের সদরদপ্তরের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগে রাখা হয়েছে। ল্যুভর কর্তৃপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনার তদন্ত চলছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটারে দর্শনার্থীদের পোস্ট করা ভিডিওতে দেখা গেছে, হামলাকারী ব্যক্তি ফরাসি ভাষায় বলছেন, ‘পৃথিবীর কথা ভাবুন। তাকে ধ্বংস করতে অনেকেই আছে।’

অপর ভিডিওতে দেখা জাদুঘরের এক কর্মী কাঁচের ওপর থেকে কেকের সাদা মাখন মুছে ফেলছেন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দা ভিঞ্চির এই সেরা শিল্পকর্মটি দেখতে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ ল্যুভরে আসেন।


যুগে যুগে মোনালিসায় ‘হামলা’:

তবে এবারই প্রথম নয়। আড়াই ফুট লম্বা ও ২ ফুট প্রশস্ত শিল্পকর্মটিকে অনেকে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা বলে দাবি করেন। এই শিল্পকর্মটির ওপর যুগে যুগে ‘হামলা’ হয়েছে।

১৯১১ সালে ল্যুভরের এক কর্মী এটি চুরিও করেছিলেন, যা এর খ্যাতি আরও বাড়িয়ে দেয়। ষোড়শ শতকের এ মাস্টারপিসকে লক্ষ্য করে হামলাও চালানো হয়েছে।

কেক পরিষ্কার করার পর ল্যুভরে মোনালিসা

১৯৫৬ সালে চিত্রকর্মটির দিকে অ্যাসিড ছোড়া হয়। এতে সেটির নিচের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর থেকেই চিত্রকর্মটি বুলেটপ্রুফ কাঁচের ভেতরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়।

২০০৫ সালে একে শক্ত ও মজবুত কেসের মধ্যে রাখা হয় যা এর তাপমাত্রা ও আদ্রতা নিয়ন্ত্রণ করে।

সংগ্রহের আয়তন ক্রমাগত বাড়ছে:

১৭৯৩ সালের ১০ আগস্ট ৫৩৭টি চিত্রকর্মের একটি প্রদর্শনীর মাধ্যমে উদ্বোধন করা ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘর।

এরপর ধীরে ধীরে সেখানে যোগ হয় প্রায় ২০ হাজার শিল্পকর্ম। তবে ধারাবাহিক অনুদান ও অধিকৃতির মাধ্যমে জাদুঘরের সংগ্রহের আয়তন ক্রমাগত বাড়ছে।

গোটা বিশ্বের নামকরা রাজনীতিবিদ, ক্রিড়া জগত, বিনোদন জগতের তারকাদের ছবি ও প্রোট্রেট রাখা আছে। ল্যুভরের চিত্রকর্ম উপভোগ করতে সারাবছর দর্শনার্থীরা আসেন।

তথ্যসূত্র: আরব নিউজ, সিএনএন, আল জাজিরা ও স্কাই নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন