সাহিত্য

আজ আকাশের মন ভালো নাই

তোমার বড় ছেলেটা খুব দুষ্ট।

দেখলে! দেখলে ব্যাপারটা!

তুমি সেলাই মেশিনে বসার সাথে সাথে ছাদে দৌড় দিল বৃষ্টিতে ভেজার জন্য। অথচ গত দুৃদিনই সে স্কুল থেকে ফেরার পথে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে বাসায় আসলো।

গতকালকেইতো, সন্ধ্যার পর তুমি ওদের বাবাকেসহ ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে।

ওর বাবা বেশ প্রশ্রয় দেয় ছেলেদের টুকটাক শখ-অহ্লাদগুলো। তুমিও পারো বটে! মনে মনে ভাবতে থাকো- ‘থাক, আমারওতো অনেকগুলো ভাই ছিলো, চোখের সামনেই বড় হতে দেখেছি। ওদের তুলনায় এই পিচ্চ দুইটা দুষ্টামী করার তেমন কোন সুযোগই পায় না।

তাছাড়া, এই বয়সে এমন দুরন্তপনা ছেলেদের থাকেই। মেয়ে হলে ভিন্ন কথা ছিলো।’ প্রায়ই মুগ্ধ হয়ে দূর থেকে তাকিয়ে থাকো ছেলে দুইটার দিকে, আর মুখে ছেলেদের নামে অভিযোগ তুলে ওদের বাবার সাথে এক ধাপ ঝগড়া করো।

তোমার সেই অভিমানের স্থায়িত্বকাল রাতে বিছানায় যাওয়ার পর আধা ঘন্টা পর্যন্ত, কখনো বা শরীর খারাপ থাকলে একটা অজুহাত দাড় করিয়ে বড়জোর এক সপ্তাহ।

ওদের বাবাও যথেষ্ট বাচ্চা সুলভ আচরণ করে তোমার সাথে। তোমার মেঝো বোনকেতো প্রায়ই বলো, তোমার নাকি একসাথে দুই ছেলে এবং তাদের বাবাসহ তিন বাচ্চাকে সামলাতে হয় !

ছেলেরা যখন পড়তে বসে, আর তুমি যখন পাঁকঘরে ওদের বাবার বেশ পছন্দের খাবার- করলা ছোট চিংড়ি দিয়ে ভাজি করছো, লোকটা তখন পা টিপে টিপে এসে তোমার কোমড়ে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে, তখন তোমার ঠোঁটে গোপনে এক চিলতে হাসির রেখা খেলে যায়।

এই হাসি ভদ্রলোক কখনো দেখে নাই। দেখলে হয়তো ভদ্রলোক এই হাসি বারবার ফিরে পেতে অনেক কিছুই বিসর্জন দিয়ে ফেলত। আজব তোমরা নারীরা!

কেন যে লুকাও! কেন যে বঞ্চিত কর প্রেম কাঙ্খিত এমন পুরুষদের। হয়তো তোমরা মিষ্টি যেই শাসনের চাপে রাখো স্বামী গোত্রকে, ভাবো একবার বুঝে গেলে যেই তাপের বলে এই চাপে রাখো তা আর ঠিক ঠাক রইবে না !

তুমিও, তুমিও অন্য দশটা সুখপ্রত্যাশী নারীদের মতই। কিছুতেই সেই সন্ধ্যা বেলার ছোট্ট খুঁনসুঁটির অভিমান থেকে সরে আসতে চাও না। যতক্ষণ অভিমানটাকে ধরে রাখা যায়, ততক্ষনই বউ পাগল লোকটা প্রতিদিনের পাওনা থেকেও বাড়তি ভালোবাসায় তোমাকে মুগ্ধ করতে চায়।

তোমাদের এই ধরনের মান-অভিমান খেলা সপ্তাহের প্রায় এক-দু’বার চলেই। তবু আজ পর্যন্ত পুরানো হয় নাই এ খেলা, বিরক্তিও ধরে নাই। এ এক তোমাদের অন্যরকম সুখ, নিজেদের মতো করে উপভোগ করা।

তোমার স্বামীর আগামীকাল অফিস সাপ্তাহিক বন্ধ। তোমার মত বুদ্ধিমতি সংসারের বউরা সারাদিনে সংসারে ঘটতে থাকা পর্বগুলোর আনুমানিক একটি ছক এঁকে কর্ম সম্পাদন করে রাখে।

সবাইকে তৃপ্তি দেয়ার জন্য সামর্থের সবটুকো চুপচাপ আয়োজন শেষ করে চেহারায় বিরক্তির ছাপ নিয়ে অন্যকাজের ব্যস্ততার ভান করে অপেক্ষা করতে থাকে, পরবর্তী পর্বে অংশগ্রহণ করার জন্যে সবাই কখন তোমাকে তাড়া ‍দিবে !

তোমার সংসার, তুমি বুঝো সবাইকে, অন্তত তোমার প্রেমে মুগ্ধ স্বমীটাকে খুব ভালো করেই বুঝো। তাই হয়তো যেমনটি ভেবে রাখো, ঠিক হুবহু তেমনই ঘটতে থাকে-

: কই ! হয়েছে, হয়েছে.. সারাদিনই কি তোমার কাজ করতে হবে ! এখন কি সেলাই করার সময় ! কি আশ্চর্য.. চলো..

: (তুমি খুব অবাক হওয়ার ভান করে-) কোথায় যাবো ! ছেলেটা যে কালকে স্কুলে যাবে… দেখো, দেখো তোমার ছেলের কান্ড! শার্টের পকেট ছিড়ে ফেলেছে, একটু যদি কথা শুনতো.. এত বারণ করি টিফিন টাইমে দৌড়া-দৌড়ি করবানা..

: ধুৎত্তরী, চলতো.. কালকে একটা শার্ট কিনে দেয়া যাবে.. এখন চলো..

: হ্যা.., তা তো দেয়া যাবেই., এই মাসে কয়টা শার্ট কিনেছো ? হিসাব করেছো ?.. অথচ ওর ক্লাসমেট রনি, দুই শার্ট দিয়ে বছর কাভার করে..

: তুমি কেনো সময়টা নষ্ট করতেছো বলতো ! রাত ১২টা হলেই সবাইকে ঘুমানোর তাড়া দিবা.., চলো.., চলোনা……

: তুমি ঘুম থেকে কখন উঠো ? বলো, কখন উঠো ? অমার দিন শুরু হয় কখন, সেটা বলতে পারো তুমি ?

ভদ্রলোক পরিবেশটা আর ঘোলা না করে পুরানো পণ্থা অবলম্বন করেন। ছাদে গিয়ে ছোট ছেলেকে পাঠিয়ে দেন।

: আম্মু বাবা ডাকে।

একি! একবার বলেই ছাদে ফিরে যাওয়ার জন্য আর অাগ্রহ দেখায় না ছেলেটা!

সোফা থেকে টিভি রিমোট নিয়ে কার্টুনের চ্যানেল ধরে মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করে। তুমি উঠে পরো সেলাই মেশিন থেকে। পাঁকঘর থেকে পাপর ভাজা আর রং চা’য়ে ভরা ফ্লাক্স নিয়ে ছোট ছেলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে এক প্রকার জোড় করে সাথে নিয়ে ছাদে উঠে যাও তুমি।

আজ আকাশে কালো মেঘেরা ছুটে বেড়াচ্ছে।

ছাদে ছাতার মতন বড় ছাউনিটার নিচে বিছানো পাটিতে পা জোড়া ছড়িয়ে কিছু একটার সাথে হেলান দিয়ে ছেলে দুইটাকে নানান প্রসঙ্গ তুলে মৃদু বকাঝকা করে শুরু করো প্রতি রবিবারের তোমার একান্ত গোপন কাঙ্খিত তোমাদের সাপ্তাহিক সুখ বিলাস।

এক মুহূর্তের জন্য সরে যায় মেঘ, চাঁদের আলোয় ছড়িয়ে দেয়া তোমার এক পায়ের রূপার নুপুর তারার মতন একবার জ্বলে উঠে।

ছোট ছেলেটা তার মাথা তোমার উরুতে রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে কি জানি ভেবে বলে-

: আম্মু, তারার কবিতা.. ঐযে তারার কবিতাটা.. আজকে তারার কবিতা.. তারার কবিতা..

তোমার ছোট ছেলের তোমার প্রতি এই অনুরোধটা শুনেই আমি ঠিক কেমন জানি দ্বিধা আর খুশির সংমিশ্রণে উত্তেজিত হয়ে পরি।

ভাবি, ‘আজকে আর যাবে কোথায়! আজকে আমায় মনে করতেই হবে তোমাকে, কত্তদিন হয়ে গেল, একবারও আমাকে মনে করো নাই, স্মৃতির কৌটায় বন্ধি আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষায় থাকি, সারাদিনে কি একবারও আমার কথা মনে পরবে না !‘

তোমার ছোট ছেলেটাকে আমার খুব ভালো লাগে, আদর করতে ইচ্ছা করে। ‍কিছুটা এ কারণে যে, সে তোমার থেকে শুনা এমন বিষয়গুলোই পছন্দ করে, যেগুলো কিনা শত শত বার আমি তোমাকে শুনিয়েছি।

সেসময় কবিতা বলতে বলতে এক সময় অনুভব করতাম আমার হাতগুলো তুমি অনেক শক্ত করে ধরেছো। আমি তাকিয়ে দেখতাম তোমার কাজল টানা কৃষ্ণ গোলক হতে ঝর্ণা বইছে, কেপে উঠা কন্ঠে ছোট্ট একটা কথা বলতে গিয়ে অন্তত চারবার ঢেঁকুর তুলতে- ‘আমাকে ছেড়ে কোথাও যেও না’।

আমি তোমার সেই আবেদন রেখেছি। আমি আজো তোমারই আছি।

তোমার ছোট ছেলেটা যখনই আমার কবিতা অথবা আমার পছন্দের গানগুলো শুনানোর জন্য তোমাকে অনুরোধ করে, প্রথম প্রথম এ ধরণের মুহূর্তে আমি খুব আগ্রহ নিয়ে তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

ভাবতাম- হয়তো কবিতাগুলো বলতে বলতে তোমার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরবে, খুব আনমনে হয়ে যাবে তুমি। তোমার ছোট ছেলে তোমার চোখ থেকে পানি গড়ানো দেখে তার বাবাকে অভিযোগ করবে- ‘বাবা, আম্মুকে বকেছ কেন’?

তোমার বড় ছেলে কোন কিছু না বুঝেই তোমাকে জড়িয়ে ধরবে। তোমার স্বামী কিছুটা ভীত চোখে তোমাকে আবার নতুন করে দেখবে, যেই তোমাকে সে এত বছরের সংসার জীবনে কখনো দেখেনি।

আমার সেই ভাবনা আমার মতই একা শূণ্যতায় ভেসে বেড়ায়। তবু সেই অনুরোধের সুর এখনো সত্য মনে হয়। সেই কবে তুমি চলে গেছ, তবু আমি তা সয়ে বেচে আছি।

কিন্তু এইভাবে, এতটা অবহেলায় তোমার স্মৃতির পৃষ্ঠা থেকে মুছে ফেলো না। এমন করে ভুলে গেলে আমি একদম সইতে পারবো না।

তোমার স্বামী এম্নিতেই তোমার সব ব্যাপারে মুগ্ধ, তুমি সাধারণ কথা বললেও তার কাছে প্রতিটা শব্দ মুক্তার দানার মতন। সে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। যা বলবে তাই সে মুগ্ধ হয়ে গিলতে থাকবে।

এবার বড় ছেলেটাও তাল দেয় ছোট ভাইয়ের সাথে-

: আম্মু প্লিজ.. অনেকদিন শুনাওনা প্লিজ.. আজকে না করো না.. তারার কবিতাটা শোনাও প্লিজ।

তুমি হাসতে থাকো। খিলখিল করে হাসতে থাকো। তোমার বর এই হাসিটুকোর জন্যেই প্রতি সপ্তাহে এই দিনে এমন আয়োজন রাখেন। তুমি রবিবারের আসরে তাকে তোমার এমন নেশা লাগানো হাসি থেকে বঞ্চিত করো না। তুমিও হাসতে থাকো.. প্রান থুলে হাসতে থাকো..

তোমার বড় ছেলে, ছোট ছেলে আর তোমার বর হয়তো তুমিও কোন কারণ ছাড়াই সেই তারা নিয়ে কবিতার কথা ভুলে গেছ।

তোমরা সবাই প্রাণ খুলে হাসছো। সেই হাসির শব্দ আজকের মেঘলা আকাশের মেঘ ভেদ করে আরো উপরে.. আরো উপরে… আরো উপরে কেউ একজন ধোয়ার মত করে যেন চুঙ্গা দিয়ে টেনে নিচ্ছে।

অবহেলা নাকি হিংসা জানি না, আমার আর সহ্য হলো না। আমি কাঁদতে শুরু করলাম।

এমন ভারী বর্ষনে তোমরা তোমাদের সুখ বিলাসের পাটি গুছিয়ে নিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করলে। সিড়ি দিয়ে নামার সময় তোমার বরের কাছে গিয়ে খুব মায়া নিয়ে জানতে চাইলে,- ‘খুব বৃষ্টি হচ্ছে, খিচুরী খাবা’?

ছেলেদের কানে কথাটা পৌঁছানো মাত্রই দু’জন একসাথে চিৎকার করে উঠল, হুরররররররে।

জানি না কেন, আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে.. আমি চিৎকার করে কান্না করছি।

আকাশে বিজলি চমকায়। বাচ্চাদের আনন্দ বাড়ে।

আর আমার একটা ছোট্ট চিরকুট লিখে তোমার কাছে পাঠাইতে ইচ্ছা করে- ‘আজ আকাশের মন ভালো নাই’।

লেখক: কমল হাসান জাহিদ, কবি সাহিত্যিক ও টিভি মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

আরও পড়ুন